জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে গবেষণাগারে সম্পূর্ণ নতুনভাবে তৈরি এক ধরনের কৃত্রিম কোষ। বিজ্ঞানীরা এমন একটি কোষ তৈরি করেছেন, যার কোনো পূর্বপুরুষ নেই এবং যার প্রতিটি অংশ পরীক্ষাগারেই নকশা করে তৈরি করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে কৃত্রিম জীববিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জৈবপ্রযুক্তিতে বড় পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে।
গবেষণাগারে তৈরি সম্পূর্ণ নতুন কোষ
গবেষকেরা এই কোষের নাম দিয়েছেন ‘স্পাডসেল’। যদিও নামটি অনেকটা রসিকতার ছলে রাখা হয়েছে, তবু এর বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব অত্যন্ত বড়। এই কোষের শরীর ও জিনগত উপাদান সম্পূর্ণভাবে গবেষণাগারে তৈরি করা হয়েছে। প্রকৃতির কোনো জীব বা কোষ থেকে এটি সরাসরি তৈরি হয়নি।
বর্তমানে স্পাডসেলের নিজস্ব বিপাকক্রিয়া নেই। এটি বিশেষভাবে তৈরি পরিবেশের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে এবং কেবল জিনে নির্ধারিত নির্দেশনা অনুসরণ করে বেড়ে ওঠে ও বিভাজিত হয়।
কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ
সাধারণ জীবন্ত কোষ নিজেরাই নতুন কোষ তৈরি করতে পারে। কিন্তু মানুষ এখন পর্যন্ত শূন্য থেকে একটি সম্পূর্ণ কার্যকর কোষ তৈরি করতে পারেনি। স্পাডসেল সেই দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আগের গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বিদ্যমান ব্যাকটেরিয়ার জিন কমিয়ে একটি ন্যূনতম জিনসমষ্টি তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই কোষগুলোর অনেক জিনের কাজ এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। নতুন পদ্ধতিতে গবেষকেরা ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। তারা প্রতিটি পরিচিত কার্যসম্পন্ন উপাদান ধাপে ধাপে যুক্ত করে কোষ তৈরি করেছেন। ফলে কোষের প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের উৎস স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হয়েছে।
কীভাবে নিজেদের সংখ্যা বাড়ায়
স্পাডসেলের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এটি নিজের সংখ্যা বাড়াতে পারে। কোষের বাইরের আবরণে বিশেষ ধরনের প্রোটিন যুক্ত হলে সেটি ভাঁজ হয়ে দুটি নতুন কোষে বিভক্ত হয়। প্রতিটি নতুন কোষে প্রয়োজনীয় জিনগত উপাদান ঠিকভাবে পৌঁছালে একই প্রক্রিয়া আবার শুরু হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, এভাবে স্পাডসেল টানা পাঁচ প্রজন্ম পর্যন্ত সফলভাবে বিভাজিত হতে পেরেছে। এটি এখনো পূর্ণাঙ্গ জীবন্ত কোষ নয়, কারণ নিজের প্রয়োজনীয় সব উপাদান তৈরি করতে পারে না। বাইরে থেকে বিশেষ পুষ্টি গ্রহণের মাধ্যমে এটি বেড়ে ওঠে।

পরিবর্তনের ক্ষমতাও রয়েছে
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্পাডসেলের মধ্যে পরিবর্তন বা বিবর্তনের প্রাথমিক বৈশিষ্ট্যও দেখা গেছে। যেসব কোষ তুলনামূলক দক্ষভাবে খাদ্য গ্রহণ করতে পারে, কয়েক প্রজন্ম পর সেই বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কোষই সংখ্যায় বেশি হয়ে ওঠে। অর্থাৎ কৃত্রিমভাবে তৈরি এই কোষেও প্রাকৃতিক নির্বাচনের মতো একটি প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
তবে এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। একটি কার্যকর স্পাডসেল তৈরি করতে গবেষকদের কয়েক বছরের শ্রম লেগেছে। তাই গবেষকেরা এমন একটি অলাভজনক উদ্যোগ শুরু করেছেন, যার লক্ষ্য এই প্রযুক্তিকে সহজ, মানসম্মত ও পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তোলা।
তাদের বিশ্বাস, ভবিষ্যতে যদি কৃত্রিম কোষ তৈরির প্রক্রিয়া সহজ করা যায়, তাহলে বিশ্বের আরও অনেক গবেষণাগার এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে পারবে এবং নতুন নতুন জৈবপ্রযুক্তি উদ্ভাবনের গতি বাড়বে।
ভবিষ্যতের প্রযুক্তির ভিত্তি হতে পারে
বিজ্ঞানীদের মতে, কৃত্রিম কোষ এখনই কোনো বাস্তব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান নয়। তবে ভবিষ্যতে নিজে নিজে গঠিত হতে পারে এবং নিয়ন্ত্রিতভাবে বংশবিস্তার করতে পারে—এমন জৈবিক ব্যবস্থা তৈরি করা গেলে চিকিৎসা, শিল্প, পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নত জৈবপ্রযুক্তিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে।
একই সঙ্গে গবেষকেরা সতর্ক করছেন, এই প্রযুক্তির উন্নয়নের পাশাপাশি স্বচ্ছতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ কৃত্রিম জীববিজ্ঞানের এই নতুন অধ্যায় ভবিষ্যতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গতিপথ বদলে দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















