বিশ্বজুড়ে ডলারের শক্তিশালী অবস্থান আবারও আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এশিয়ার কয়েকটি বড় অর্থনীতির মুদ্রা সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হওয়ায় নতুন করে ১৯৮৫ সালের ঐতিহাসিক প্লাজা চুক্তির মতো একটি বৈশ্বিক সমঝোতার প্রস্তাব উঠছে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় সেই ধরনের উদ্যোগ সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই সীমিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ডলারের উত্থানে বাড়ছে চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানে থাকায় এবং দেশটির প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের প্রবণতা বাড়ায় ডলারের চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার মুদ্রা বহু বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছেছে। একইভাবে জাপানের মুদ্রাও কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে নেমে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে চীনের মুদ্রার দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারসাম্য নষ্ট করছে বলে অনেকের ধারণা। তাই অতীতের মতো সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে ডলারের শক্তি কমানোর আলোচনা আবারও সামনে এসেছে।
কেন আলোচনায় প্লাজা চুক্তি
১৯৮৫ সালে বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে হওয়া প্লাজা চুক্তির মাধ্যমে সমন্বিতভাবে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করা হয়েছিল। এর ফলে কয়েক বছরের মধ্যে ডলারের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং অন্যান্য বড় মুদ্রার মান বাড়ে।
সে সময় এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সমন্বয়ের অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়েছিল। অনেক বিনিয়োগকারীও সেই পরিবর্তন থেকে বড় ধরনের লাভ করেছিলেন।
এখনকার বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন
বিশ্লেষকদের মতে, চার দশক আগের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান বিশ্বের বড় পার্থক্য রয়েছে। এখন বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের আকার এতটাই বেড়েছে যে কয়েকটি দেশের যৌথ হস্তক্ষেপ দিয়ে বাজারের গতিপথ বদলে দেওয়া অনেক বেশি কঠিন।
বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন হয়, তা আগের তুলনায় বহুগুণ বেড়ে গেছে। ফলে শুধু কয়েকটি উন্নত অর্থনীতির উদ্যোগ এখন আর আগের মতো প্রভাব ফেলতে পারবে না।

চীনকে ছাড়া সমাধান অসম্ভব
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চীনের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চীনের হাতে রয়েছে। পাশাপাশি দেশটির মুদ্রার মূল্য নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বিতর্ক চলছে।
এ কারণে নতুন কোনো বৈশ্বিক মুদ্রা সমঝোতা কার্যকর করতে হলে চীনের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই সম্ভাবনা খুবই কম।
বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারকদের বড় একটি অংশ মনে করেন, ১৯৮৫ সালের চুক্তির পর জাপানের মুদ্রার মূল্য বৃদ্ধি দেশটির দীর্ঘ অর্থনৈতিক স্থবিরতার অন্যতম কারণ ছিল। তাই একই ধরনের ব্যবস্থায় অংশ নিতে চীন আগ্রহী হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নীতিও বড় বাধা
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতের প্লাজা চুক্তি শুধু মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপের কারণে সফল হয়নি। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র বাজেট ঘাটতি কমানোর উদ্যোগও নিয়েছিল, যা ডলারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছিল।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি তুলনামূলক অনেক বেশি। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় কমানোর মতো শক্ত রাজনৈতিক ঐকমত্যও দেখা যাচ্ছে না। ফলে কেবল মুদ্রাবাজারে সমন্বিত পদক্ষেপ নিলেই আগের মতো ফল পাওয়া কঠিন হবে।
সহজ সমাধানের সুযোগ নেই
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় ডলারের শক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নীতি, চীনের অবস্থান এবং বৈশ্বিক পুঁজির প্রবাহ—সব মিলিয়ে মুদ্রাবাজার অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে নতুন কোনো প্লাজা ধরনের সমঝোতা হলেও তা ১৯৮৫ সালের মতো নাটকীয় পরিবর্তন আনতে পারবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে শুধু একটি চুক্তির ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনৈতিক নীতি, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয়ই বেশি কার্যকর হতে পারে।
নতুন প্লাজা চুক্তির আলোচনা বাড়লেও বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতির জটিল বাস্তবতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, অতীতের ইতিহাস হুবহু পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















