পুঁজিবাজারবান্ধব বাজেট, নিয়ন্ত্রক সংস্কারের প্রত্যাশা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ার ইতিবাচক প্রভাবে দেশের শেয়ারবাজারে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২২ মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো ৫,৭০০ পয়েন্ট অতিক্রম করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স।
সপ্তাহজুড়ে বাজারের চিত্র
ব্যাংক হলিডের কারণে সপ্তাহে চার কার্যদিবস লেনদেন হয়। প্রথম তিন কার্যদিবসে ধারাবাহিকভাবে সূচক বাড়লেও শেষ দিনে সামান্য সংশোধন দেখা যায়। তবে শেষ দিনের এই পতন সামগ্রিক ইতিবাচক ধারাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি।
সপ্তাহ শেষে ডিএসইএক্স সূচক ৯১ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৬১ শতাংশ বেড়ে ৫,৭৪৪ পয়েন্টে পৌঁছায়। আগের সপ্তাহে সূচক ৯ পয়েন্ট কমেছিল।
এদিকে ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএস৩০ বেড়ে দাঁড়ায় ২,১৬২ পয়েন্টে এবং শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক ২৫ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ১,১৬৯ পয়েন্টে উন্নীত হয়।

সংস্কার প্রত্যাশায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রক সংস্কার এবং সরকারের ধারাবাহিক ইতিবাচক বার্তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে। ফলে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক এবং সিটি ব্যাংকের শেয়ার মিলিয়ে প্রধান সূচকের সাপ্তাহিক উত্থানে ২৮ পয়েন্টের অবদান রাখে।
রয়্যাল ক্যাপিটালের গবেষণা বিভাগের প্রধান আকরামুল আলম বলেন, দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়া, বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকা, মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমে আসা এবং পুঁজিবাজারে সরকারের বাড়তি মনোযোগ বাজার পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিএসইসির নতুন নেতৃত্বে ইতিবাচক বার্তা
জুনের শুরুতে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট মাসুদ খানকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান নিয়োগের পর বাজারে সংস্কারের প্রত্যাশা আরও জোরালো হয়।
নতুন নেতৃত্ব ইতোমধ্যে বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, সার্কিট ব্রেকার ও লেনদেনবিধি নির্ধারণে স্টক এক্সচেঞ্জের ক্ষমতা পুনর্বহাল এবং বাজার তদারকি জোরদারের মতো বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে।
বাজেটে পুঁজিবাজারবান্ধব উদ্যোগ
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে লভ্যাংশ আয়ের ওপর কর কমানো, মিউচুয়াল ফান্ডে কর-ছাড় সুবিধার বিনিয়োগসীমা তুলে দেওয়া, তালিকাভুক্তির শর্ত সহজ করা এবং ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের জন্য জিরো-কুপন বন্ডের কর-ছাড় বহাল রাখার মতো উদ্যোগ বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) বলেছে, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও), জিরো-কুপন বন্ড, লভ্যাংশ আয়, ব্যাংকিং খাতের সহায়তা এবং মিউচুয়াল ফান্ডের কর কাঠামো যৌক্তিক করায় বাজার আরও শক্তিশালী হবে।
লেনদেন ও খাতভিত্তিক চিত্র
সপ্তাহে ডিএসইতে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহের ৪ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি। দৈনিক গড় লেনদেন বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ৫১ শতাংশ বেশি।
খাতভিত্তিক লেনদেনে শীর্ষে ছিল বস্ত্র খাত, যার অংশ ছিল ১২ দশমিক ৭ শতাংশ। এরপর ছিল ব্যাংকিং খাত ১২ শতাংশ এবং ওষুধ খাত ১১ শতাংশ।

সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৯১টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২৭২টির দাম বেড়েছে, ৯০টির কমেছে এবং ২৯টির দাম অপরিবর্তিত ছিল।
প্রকৌশল, বিদ্যুৎ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ওষুধ ও টেলিযোগাযোগসহ সব প্রধান খাতই ইতিবাচক অবস্থানে ছিল।
সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে বেক্সিমকোর শেয়ারে। এর পরের অবস্থানে ছিল ব্র্যাক ব্যাংক, মালেক স্পিনিং, আইপিডিসি ফাইন্যান্স এবং সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। সিএএসপিআই সূচক ২৫৮ পয়েন্ট বেড়ে ১৫,৪০৮ এবং সিএসসিএক্স সূচক ১৭৩ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৯,৪৩৭ পয়েন্টে পৌঁছায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















