উইম্বলডন ২০২৬-এর অন্যতম বড় চমক হয়ে উঠেছেন ২৩ বছর বয়সী ব্রিটিশ ওয়াইল্ড কার্ড আর্থার ফেরি। টুর্নামেন্টের চতুর্থ রাউন্ডে উঠে তিনি এখন ব্রিটিশদের শেষ ভরসা। সোমবার সেন্টার কোর্টে তাঁর প্রতিপক্ষ সাবেক বিশ্ব তিন নম্বর এবং জনপ্রিয় তারকা গ্রিগর দিমিত্রভ। নিজ শহরের সবচেয়ে বড় মঞ্চে অভিষেকের আগে ফেরিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বাড়তি আগ্রহ।
উইম্বলডনের তৃতীয় রাউন্ডে জয়ের পথে ফেরিকে অস্বস্তিকর এক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে তাঁর নাক থেকে রক্ত পড়তে শুরু করে। চিকিৎসার জন্য খেলা বারবার থামাতে হওয়ায় প্রতিপক্ষও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। পরে ফেরি বলেন, এটি আগে কয়েকবার হলেও খুব নিয়মিত নয় এবং ভবিষ্যতে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করবেন। তাঁর ভাষায়, কখনও কখনও যখন ম্যাচের গতি তাঁর পক্ষেই ছিল, তখনও খেলা থামাতে হওয়ায় তিনিও বিরক্ত হয়েছেন।
নিজ শহরে স্বপ্নের যাত্রা
ফ্রান্সের সেভরে জন্ম হলেও আর্থার ফেরির বেড়ে ওঠা উইম্বলডনের অল ইংল্যান্ড ক্লাব থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে। স্থানীয় কিংস কলেজ স্কুলে পড়াশোনা করেছেন তিনি। ফলে এবারের টুর্নামেন্টে গ্যালারিতে প্রতিটি ম্যাচেই উপস্থিত ছিলেন তাঁর পরিবারের সদস্য, বন্ধু এবং পরিচিতজনেরা। ছোটবেলায় যেসব বন্ধু বল বয়ের দায়িত্ব পালন করতেন, তাঁদের অনেকেই এবারও টুর্নামেন্টের সঙ্গে যুক্ত।

ফেরির ছোট ভাই ম্যাক্সিম এবারের উইম্বলডনে খেলোয়াড়দের র্যাকেট বহনের দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয় পরিবেশ ও পরিচিত দর্শকদের সমর্থন ফেরির আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
দ্রুত উত্থানের গল্প
মাত্র দেড় বছর আগে পূর্ণকালীন পেশাদার টেনিসে নাম লেখান ফেরি। গত বছর তাঁর বিশ্ব র্যাঙ্কিং ছিল ৪৬১ এবং সে সময় তিনি হাড়ের চোটে ভুগছিলেন। এবারের উইম্বলডন শুরুর আগে তাঁর র্যাঙ্কিং উঠে আসে ১১৪ নম্বরে।
চতুর্থ রাউন্ডে পৌঁছে তিনি শুধু টুর্নামেন্টে টিকে থাকা শেষ ব্রিটিশ খেলোয়াড়ই নন, এই শতকে একক বিভাগে শেষ ষোলোতে ওঠা মাত্র পঞ্চম ব্রিটিশ পুরুষ খেলোয়াড়। এর আগে এই কীর্তি গড়েছিলেন টিম হেনম্যান, গ্রেগ রুসেদস্কি, অ্যান্ডি মারে ও ক্যামেরন নরি।
ফেরি নিজেই বলেন, নিজের শহরে প্রথম পাঁচ সেটের ম্যাচ জেতা, প্রথমবার শীর্ষ একশোর কাছাকাছি পৌঁছানো এবং প্রথমবার কোনো গ্র্যান্ড স্লামের দ্বিতীয় সপ্তাহে ওঠা—সবকিছু একসঙ্গে হওয়ায় এটি তাঁর জন্য বিশেষ এক গল্প।
খেলাধুলাই পরিবারের পরিচয়

খেলাধুলার সঙ্গে ফেরির পরিবারের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তাঁর মা অলিভিয়া ফেরি সাবেক পেশাদার টেনিস খেলোয়াড়। ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ র্যাঙ্কিং ছিল ২২৫ এবং তিনি লন টেনিস অ্যাসোসিয়েশনেও কাজ করেছেন।
বাবা লোইক ফেরি দীর্ঘদিন ফরাসি ফুটবল ক্লাব এফসি লরিয়ঁর মালিক ছিলেন। পরিবারের অন্য সদস্যরাও খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত। বোন আলবান যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়ে অংশ নিয়েছেন এবং ভাই ম্যাক্সিম লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি টেনিস ও ফুটবল খেলেন।
বাবা লোইক ফেরির দাবি, কখনও ছেলের ওপর পেশাদার খেলোয়াড় হওয়ার চাপ দেননি। বরং পড়াশোনার ওপর গুরুত্ব দিতে উৎসাহ দিয়েছেন।
শিক্ষা ও টেনিস—দুই পথেই এগিয়েছেন
ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সমাজবিষয়ক পড়াশোনা করেছেন ফেরি। তিনি মনে করেছিলেন, টেনিসে সফল না হলে উচ্চশিক্ষা তাঁর জন্য বিকল্প পথ তৈরি করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ টেনিস সার্কিটের এক নম্বর খেলোয়াড়ও ছিলেন।
শৈশবে কিছুদিন ফ্রান্সের হয়ে খেললেও পরে ব্রিটেনের প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নেন। এখন নিজেকে হৃদয়ে একজন ব্রিটিশ বলেই মনে করেন এবং দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে গর্ববোধ করেন।
সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
তৃতীয় রাউন্ডে জয়ের পর ফেরির দল একই কোর্টে আবার খেলতে চাইলেও চতুর্থ রাউন্ডে তাঁকে খেলতে হবে ঐতিহ্যবাহী সেন্টার কোর্টে। প্রায় ১৪ হাজার দর্শকের সামনে সাবেক বিশ্ব তিন নম্বর গ্রিগর দিমিত্রভের বিপক্ষে এটি হবে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ম্যাচগুলোর একটি।
ফেরির বিশ্বাস, বড় দর্শকসমাগমের সামনে খেলার জন্য তিনি প্রস্তুত। তবে ম্যাচ চলাকালে আবেগে ভেসে না গিয়ে নিজের খেলায় মনোযোগ ধরে রাখাই তাঁর লক্ষ্য। ম্যাচের আগে নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে তিনি নিয়মিত হাউস মিউজিক শোনেন। তাঁর কোচদের মতে, উচ্চতা তুলনামূলক কম হলেও অসাধারণ কোর্ট মুভমেন্ট এবং নিজের সামর্থ্যের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসই ফেরির সবচেয়ে বড় শক্তি।
উইম্বলডনের দ্বিতীয় সপ্তাহে এখন ব্রিটিশ দর্শকদের সব আশা তাই আর্থার ফেরিকেই ঘিরে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















