ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান ও জানাজায় তেহরানে লাখো মানুষের সমাগম হলেও সবার নজর ছিল এক ব্যক্তির দিকে—তার উত্তরসূরি মোজতবা খামেনি। কিন্তু তিনি কোথাও প্রকাশ্যে আসেননি। ইসরায়েলি বিমান হামলায় আহত হওয়ার পর গত চার মাস ধরে তিনি জনসমক্ষে অনুপস্থিত রয়েছেন। তার শারীরিক অবস্থা, নেতৃত্ব গ্রহণের সক্ষমতা এবং নিরাপত্তা—সবকিছু ঘিরেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
দ্য টাইমসের ক্যাথরিন ফিলিপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে জানাজার সময় আলী খামেনির তিন ছেলে—মোস্তাফা, মাসউদ ও মেইসাম খামেনি—কফিনের পাশে উপস্থিত ছিলেন। তবে দ্বিতীয় পুত্র ও ঘোষিত উত্তরসূরি মোজতবা খামেনি অনুপস্থিত ছিলেন।
উত্তরসূরিকে ঘিরে বাড়ছে প্রশ্ন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনি আত্মগোপনে রয়েছেন। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সম্প্রতি তাকে হত্যার হুমকি পুনর্ব্যক্ত করায় নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার প্রতি তার সমর্থন ইরানের কট্টরপন্থী মহলে চাপও সৃষ্টি করেছে।
ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় শীর্ষ নেতাদের প্রকাশ্য উপস্থিতি সবসময়ই প্রতীকী বার্তা বহন করে। ফলে নতুন সর্বোচ্চ নেতার দীর্ঘ অনুপস্থিতি নিয়ে দেশজুড়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে।
জানাজায় ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর উপস্থিতি
রবিবারের জানাজায় ইরানের প্রেসিডেন্ট, পার্লামেন্টের স্পিকার এবং বিচার বিভাগের প্রধানসহ সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাস্তবে দেশটির সবচেয়ে বড় ক্ষমতার কেন্দ্র ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
আইআরজিসির কমান্ডার জেনারেল আহমদ বাহিদিও দীর্ঘ সময় পর প্রকাশ্যে উপস্থিত হন। তিনি সরকারি নির্ধারিত স্থানে না থেকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নামাজ আদায় করেন। অনুষ্ঠান শেষে তাকে ঘিরে প্রতিশোধের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন উপস্থিত শোকাহত জনতা।
শোকানুষ্ঠানে প্রতিশোধের আহ্বান
পুরো শোকানুষ্ঠানে প্রতিশোধের আহ্বান ছিল অন্যতম প্রধান বিষয়। এক ধর্মীয় বক্তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার আহ্বান জানালে উপস্থিত জনতার ব্যাপক সাড়া দেখা যায়। অনেকের হাতে ইংরেজিতে লেখা ‘Kill Trump’ এবং ‘Trump Must Be Killed’ লেখা প্ল্যাকার্ডও দেখা যায়।

আলী খামেনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রচারে তাকে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। তার মৃত্যুর পর মুষ্টিবদ্ধ হাতের প্রতীককে কেন্দ্র করে নতুন প্রচারণা শুরু হয়েছে। তেহরানের রেভল্যুশন স্কয়ারে সেই প্রতীক নিয়ে বিশাল ভাস্কর্যও স্থাপন করা হয়েছে। সোমবার তার কফিন ছয় মাইল দীর্ঘ শোকযাত্রায় বহন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং এ উপলক্ষে পুরো দিনের জন্য ইরানের আকাশসীমা বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
মোজতবার ভবিষ্যৎ উপস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা
মোজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠদের একটি অংশের দাবি, তিনি বাবার শেষ দাফন অনুষ্ঠানের অন্তত একটি অংশে অংশ নিতে চান। বৃহস্পতিবার পবিত্র শহর মাশহাদে দাফনের সময় তার উপস্থিতির সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। তবে অন্য সূত্রগুলোর মতে, নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে তার অংশগ্রহণ ইতোমধ্যেই বাতিল করা হয়েছে।
৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি দীর্ঘদিন ধরেই তার বাবার কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন এবং ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতেন। বড় ভাই মোস্তাফা একজন প্রভাবশালী শিয়া আলেম হলেও তার কোনো সরকারি পদ নেই। তৃতীয় ভাই মাসউদ সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের প্রচারযন্ত্র পরিচালনা করেন এবং ছোট ভাই মেইসামও একই দপ্তরে কাজ করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় আলী খামেনির পাশাপাশি তার পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য নিহত হন। তাদের কফিনও একসঙ্গে রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে রাখা হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















