ভারতের শহরগুলোতে শুধু দিনের তাপদাহ নয়, রাতের গরমও এখন বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাতের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় মানুষ শরীরকে স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা করার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে ঘুমের ব্যাঘাত, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ এবং কংক্রিটনির্ভর নির্মাণের কারণে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
রাতের ঘুম এখন বড় চ্যালেঞ্জ
দিল্লির বহু নিম্নআয়ের পরিবারের মতো অনেকেই গরমের সময় ঘরের ভেতর ঘুমাতে পারেন না। জানালাবিহীন ছোট ঘর রাতের বেলায় চুল্লির মতো গরম হয়ে ওঠে। তাই অনেক পরিবার ছাদে বা খোলা জায়গায় রাত কাটানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তীব্র গরমে অনেক সময় সেখানেও স্বস্তি মেলে না।
দিনের পরিশ্রমের পর পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ায় কর্মক্ষেত্রে ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে এর প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে।
গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতের প্রায় সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রাতের তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০১২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ জেলায় প্রতি গ্রীষ্মে অন্তত পাঁচটি অতিরিক্ত উষ্ণ রাত যুক্ত হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ২৮ শতাংশ জেলায় অস্বাভাবিক গরম দিনের সংখ্যাও বেড়েছে।
২০২৬ সালের মে মাসে দিল্লিতে প্রায় ১৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে উষ্ণ রাতের রেকর্ড হয়। বর্ষা শুরু হলেও উচ্চ আর্দ্রতার কারণে অনেক এলাকায় রাতের অস্বস্তিকর গরম থেকে যাচ্ছে।
কেন বাড়ছে রাতের তাপমাত্রা
বিশেষজ্ঞদের মতে, কংক্রিটের ভবন দিনের বেলায় প্রচুর তাপ শোষণ করে এবং রাতে ধীরে ধীরে তা ছেড়ে দেয়। ফলে শহরজুড়ে তৈরি হয় ‘নগর তাপ দ্বীপ’ প্রভাব। একই সঙ্গে কমে যাওয়া সবুজ এলাকা, গাছপালা নিধন, ধুলাবালি, বায়ুদূষণ এবং বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধিও রাতের তাপ আটকে রাখে।
উপকূলীয় শহরগুলোতে বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। জলীয় বাষ্প নিজেও তাপ আটকে রাখে এবং দূষণ কণার সঙ্গে মিলে গরমকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে।
ঘরের ভেতরের গরমই বড় বিপদ

টিনের ছাদ বা কংক্রিটের ছোট ঘরগুলোতে বসবাসকারী নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। অনেক বাড়িতে পর্যাপ্ত জানালা নেই, আবার অনেকের পক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহার করা সম্ভব নয়। ফলে রাতভর ঘরের ভেতর তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেশি থাকে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু শহরে সূর্য ডোবার অনেক ঘণ্টা পরও ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকে। একই সঙ্গে আর্দ্রতা ৭৫ শতাংশের বেশি থাকায় শরীর ঘামের মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হতে পারে না।
স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে
চিকিৎসকদের মতে, শরীর যদি রাতে পর্যাপ্ত ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ না পায়, তাহলে তাপজনিত চাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকে। এর ফলে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে, পাশাপাশি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগ আরও জটিল হতে পারে।
এছাড়া দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত গরমে থাকার কারণে বমিভাব, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দেয়। গবেষকরা নারীদের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী তাপ ও দূষণের সম্মিলিত প্রভাব গর্ভধারণের ফলাফলেও প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তা নিয়েও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

কী হতে পারে সমাধান
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবনের ছাদে প্রতিফলক রং ব্যবহার, শ্রমজীবী মানুষের জন্য শীতল আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি, রাতের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা জোরদার এবং শহরে আরও বেশি গাছ লাগানো জরুরি। পাশাপাশি নতুন শহর পরিকল্পনার সময় এমনভাবে রাস্তা ও ভবন নির্মাণ করতে হবে, যাতে স্বাভাবিক বাতাস চলাচলের পথ খোলা থাকে এবং শীতল বাতাস সহজে শহরের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে।
তাদের মতে, ইতোমধ্যে নির্মিত শহর পরিবর্তন করা কঠিন হলেও ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনায় তাপ সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তুললে বাড়তে থাকা রাতের গরমের প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব।
রাতের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এখন আর কেবল একটি আবহাওয়াগত ঘটনা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, নগর পরিকল্পনা এবং জলবায়ু অভিযোজনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















