সোমবার বেইজিং সময় দুপুর ১২টা ১ মিনিটে চীনের একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে একটি কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। চীনা নৌবাহিনীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রশিক্ষণ-অনুশীলনের ডামি ওয়ারহেড বহনকারী ক্ষেপণাস্ত্রটি নির্ধারিত সমুদ্র এলাকায় নির্ভুলভাবে গিয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাকে বার্ষিক সামরিক মহড়ার নিয়মিত অংশ বলে উল্লেখ করলেও জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড তাৎক্ষণিক উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
জাপান সরকার জানিয়েছে, চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আগেই টোকিওকে জানিয়েছিল যে কেপ শিওনোমিসাকির দক্ষিণে একটি নির্দিষ্ট এলাকা চিহ্নিত করা হবে। জাপান চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানালেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং একে অস্থিতিশীল বলে অভিহিত করেছেন, আর নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স বলেছেন, দীর্ঘদিনের উদ্বেগ সত্ত্বেও নোটিশ দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চীন পরীক্ষা চালিয়েছে, যা তাঁদের কাছে অস্বস্তিকর।
সামুদ্রিক নজরদারি প্রতিষ্ঠান স্টারবোর্ড মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্সের বিশ্লেষক মার্ক ডগলাসের পর্যবেক্ষণ, চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত হলেও এর সময় বেছে নেওয়া তাৎপর্যপূর্ণ, অস্ট্রেলিয়া ও ফিজির নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি সইয়ের ঠিক পরদিনই এই নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালে চীন প্রায় চার দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছিল, আর গত বছরের সামরিক কুচকাওয়াজে তারা তাদের সবচেয়ে আধুনিক সাবমেরিন-বাহিত ক্ষেপণাস্ত্র জেএল-থ্রি প্রদর্শন করেছিল, যা মূল ভূখণ্ড থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড লক্ষ্য করতে সক্ষম বলে বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন। নিউজিল্যান্ডভিত্তিক এই সংস্থার তথ্যমতে, উপগ্রহ ট্র্যাকিং সরঞ্জামবাহী তিনটি চীনা জাহাজ পরীক্ষার আগে থেকেই প্রশান্ত মহাসাগরের বিভিন্ন অংশে অবস্থান নিয়েছিল, যা প্রমাণ করে এই উৎক্ষেপণ আগে থেকেই সুনির্দিষ্টভাবে পরিকল্পিত ছিল। অস্ট্রেলিয়া ও ফিজির মধ্যে সদ্য সই হওয়া প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় উভয় দেশ পরস্পরকে আক্রান্ত হলে পারস্পরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা প্রশান্ত মহাসাগরে বেইজিংয়ের প্রভাব ঠেকাতে পশ্চিমা জোটবদ্ধতার সাম্প্রতিক প্রচেষ্টার একটি উদাহরণ।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা তুলনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের মতো একটি প্রতিবেশী দেশও যখন আগাম নোটিশ পাওয়ার পরও প্রতিরোধ করতে পারে না, তখন ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য বৃহৎ শক্তির সামরিক তৎপরতা মোকাবিলার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একই সময়ে চীনের লিয়াওনিং বিমানবাহী রণতরী উপকূল থেকে আরও দূরে টহল দিচ্ছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ মহড়াও চালাচ্ছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করছে। বাংলাদেশের মতো ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, সমুদ্রপথে বৃহৎ শক্তিগুলোর সামরিক তৎপরতা বাড়লে আঞ্চলিক নৌ-বাণিজ্য ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর তার পরোক্ষ প্রভাব এড়ানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
নোটিশ দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা সম্পন্ন করার এই ধরন ভবিষ্যতে আঞ্চলিক আস্থার সংকট আরও গভীর করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা, বিশেষত যখন একই সপ্তাহে একটি নতুন প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রতিরক্ষা জোট আত্মপ্রকাশ করেছে এবং আরও একটি সুপার টাইফুন একই অঞ্চল দিয়ে বয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে, যা সব মিলিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে একযোগে কূটনৈতিক ও প্রাকৃতিক দুই ধরনের অস্থিরতার মুখে ফেলেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















