১২:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
বিমান ভঙ্গিমার ব্যায়ামে বাড়ান ভারসাম্য, শক্তি ও শরীরের সৌন্দর্য শতবর্ষী গোলাপি বাড়ির রূপকথা, নতুন জীবনের স্বপ্ন পূরণ করলেন ইলিন কেলি প্রেম, বিয়ে ও অভিবাসনের জটিল গল্প: ভালোবাসার জন্য নেওয়া এক বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রেসি অ্যাব্রামসের নতুন স্বপ্ন, গান থেকে অভিনয়ের পথে যাত্রা জর্জ লুকাসের স্বপ্নের জাদুঘর: গল্প, শিল্প ও মানুষের কল্পনার নতুন ঠিকানা ভালোবাসা থেকে বিয়ের শপথ, অনিশ্চয়তার মাঝেও তৈরি হলো এক নতুন জীবন ঢাকায় ২৫ জুলাই আইএআইএলসি প্রেস্টিজ অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬, নেতৃত্ব ও উদ্ভাবনের স্বীকৃতির আয়োজন মেক্সিকো-গুয়াতেমালা সীমান্তে ৭ দশমিক ৩ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প, কেঁপেছে বিস্তীর্ণ অঞ্চল ক্রিকেট কিংবদন্তি গারফিল্ড সোবার্স আর নেই, শোকের ছায়া বিশ্ব ক্রিকেটে যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির বাজার স্থিতিশীল, তবুও দীর্ঘ বেকারত্বে আটকে লাখো মানুষ

ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির একমাত্র বাস্তব পথ

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বহু দশক ধরে একটি ধারণা বারবার ফিরে এসেছে—ফিলিস্তিন প্রশ্নকে আপাতত পাশে রেখে অন্য আঞ্চলিক সংকটগুলোর সমাধান করা সম্ভব। কখনও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, কখনও ইরানের প্রভাব সীমিত করা, কখনও আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ—প্রতিবারই মনে করা হয়েছে, ফিলিস্তিন ইস্যু পরে দেখা যাবে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলো আবারও প্রমাণ করেছে, এই ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। গাজার যুদ্ধ, লেবাননের অস্থিরতা, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক বিভাজন দেখিয়ে দিয়েছে যে ফিলিস্তিন প্রশ্নকে অমীমাংসিত রেখে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। সেই সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে একই সঙ্গে এটাও স্পষ্ট যে, ওয়াশিংটনের নীতিতে ফিলিস্তিন বরাবরই একটি গৌণ বিষয় হয়ে থেকেছে। যখনই শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে, তখনই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে; আলোচনা ভেঙে পড়লেই আবার সেটি অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে হারিয়ে গেছে। এই ওঠানামার রাজনীতি শুধু কূটনৈতিক ব্যর্থতাই তৈরি করেনি, বরং ফিলিস্তিনি সমাজে হতাশা, অবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক চরমপন্থার জন্যও উর্বর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

ইতিহাস দেখায়, কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা কখনও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি। দুই দশক আগে পশ্চিম তীরে প্রশাসনিক সংস্কার, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যখন অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা মনে করেছিল ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্য ছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিশ্বাস জন্মেছিল যে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বাধীন রাষ্ট্রের দিকে এগোনো সম্ভব।

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে ডেস্ট্রয়ার নিয়ে যোগ দিল যুক্তরাষ্ট্র

কিন্তু এই অগ্রগতি স্থায়ী হয়নি। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতা, দুর্নীতি, নির্বাচনী স্থবিরতা এবং সবচেয়ে বড় কথা, ইসরায়েলি নীতির পরিবর্তনের ফলে সেই সম্ভাবনা ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক ক্ষমতা সংকুচিত হওয়া এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কারণে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জনগণের চোখে ক্রমেই অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। যখন একটি সরকার নিজের কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন দিতে পারে না, রাজস্বের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকে না এবং জনগণের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, তখন তার প্রতি মানুষের আস্থা ধরে রাখা কঠিন।

এই শূন্যস্থানই চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি করে। যখন মানুষ দেখে আলোচনার মাধ্যমে কোনো পরিবর্তন আসছে না, তখন অনেকেই শক্তি প্রয়োগের পথকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। এটি শুধু রাজনৈতিক বাস্তবতা নয়; সংঘাতপূর্ণ বিশ্বের বহু অঞ্চলে একই অভিজ্ঞতা দেখা গেছে। ফলে সহিংসতা নতুন করে সহিংসতাকেই জন্ম দেয়, আর রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা আরও দূরে সরে যায়।

অনেকেই মনে করেন, হামাসকে দুর্বল করলেই সমস্যার সমাধান হবে। বাস্তবতা এত সরল নয়। কোনো একটি সংগঠনকে সামরিকভাবে দুর্বল করা সম্ভব হলেও, যে রাজনৈতিক ও সামাজিক শূন্যতা থেকে সেই সংগঠনের উত্থান ঘটে, সেটি যদি অক্ষত থাকে, তাহলে নতুন কোনো শক্তি আবার সেই জায়গা পূরণ করবে। ইতিহাসে এমন উদাহরণ অসংখ্য।

এ কারণেই ফিলিস্তিন প্রশ্নকে শুধুমাত্র নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে দেখা ভুল। এটি মূলত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, রাষ্ট্রীয় বৈধতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। যদি জনগণ বিশ্বাস করে যে তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বৈধ রাজনৈতিক পথ খোলা আছে, তাহলে সহিংসতার প্রতি সমর্থনও ধীরে ধীরে কমে আসে। আর যদি সেই পথ বন্ধ থাকে, তাহলে অস্ত্রধারী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়।

Managing Palestine's Looming Leadership Transition | International Crisis  Group

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের পুনর্গঠন। বহু বছর ধরে নির্বাচন না হওয়া, নেতৃত্বের বয়স ও অকার্যকারিতা এবং জবাবদিহির অভাব ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দুর্বল করেছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত, জবাবদিহিমূলক এবং প্রশাসনিকভাবে দক্ষ নেতৃত্ব ছাড়া কোনো রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। গণতান্ত্রিক বৈধতা শুধু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য নয়, নিজের জনগণের আস্থা অর্জনের জন্যও অপরিহার্য।

অবশ্য নির্বাচন আয়োজন করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। নির্বাচন এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ হওয়া উচিত, যেখানে বিভিন্ন মতের রাজনৈতিক শক্তি শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারে এবং সহিংসতাকে প্রত্যাখ্যান করা হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক শর্ত হিসেবে। এতে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়বে এবং চরমপন্থার আকর্ষণ কমবে।

ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে ইসরায়েলের ভূমিকাও অনিবার্য। বর্তমান বাস্তবতায় সীমান্ত, রাজস্ব, চলাচল, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তার বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। ফলে ইসরায়েলের সহযোগিতা ছাড়া কোনো কার্যকর রাষ্ট্রীয় কাঠামো দাঁড় করানো প্রায় অসম্ভব। কিন্তু সহযোগিতা মানে নিরাপত্তা উদ্বেগকে উপেক্ষা করা নয়; বরং এমন একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো তৈরি করা, যেখানে উভয় পক্ষই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার লাভ দেখতে পায়।

পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং সহিংসতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রতিটি নতুন বসতি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমঝোতার পরিসর সংকুচিত করে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে এই ধারণা জোরদার হয় যে আলোচনার মাধ্যমে তারা কিছুই অর্জন করতে পারবে না। ফলে শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা ক্রমাগত ক্ষয়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও নতুনভাবে মূল্যায়নের সময় এসেছে। ওয়াশিংটন যদি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা চায়, তাহলে তাকে শুধু যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের জন্য একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক কৌশল। এর মধ্যে থাকবে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনৈতিক সহায়তা, রাজনৈতিক পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বাস্তব রূপরেখা।

The EU's 'Geopolitical Actorness' in the Gulf: Purpose, State of Play, and  Potential - ORF Middle East

একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরব রাষ্ট্রগুলো এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদেরও আরও সমন্বিত ভূমিকা নিতে হবে। অতীতে আন্তর্জাতিক সহায়তা অনেক সময় শুধু মানবিক ত্রাণে সীমাবদ্ধ থেকেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন টেকসই প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কার্যকর সুশাসনের ভিত্তি তৈরি করা।

গাজার যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদি যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও গাজা ও পশ্চিম তীর আলাদা রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিচালিত হয়, তাহলে কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণা আরও দুর্বল হবে। তাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে একটি বৈধ, গ্রহণযোগ্য এবং একীভূত ফিলিস্তিনি প্রশাসন, যা পুরো ভূখণ্ডের প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম।

অনেকে রাষ্ট্র গঠনের ধারণাকে অবাস্তব বা অতিরিক্ত আদর্শবাদী বলে মনে করেন। কিন্তু বিকল্প কী? গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ বন্ধ রেখে শুধু সামরিক ব্যবস্থা, অবরোধ বা অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির ওপর নির্ভর করলে সংঘাত আবার ফিরে আসে। প্রতিবারই তার মানবিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক মূল্য আরও বেড়ে যায়।

শান্তি কখনও কেবল যুদ্ধ থামানোর নাম নয়। শান্তি তখনই টেকসই হয়, যখন মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং নিরাপত্তা একই সঙ্গে নিশ্চিত হয়। ফিলিস্তিন প্রশ্নেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। আত্মনিয়ন্ত্রণের বৈধ আকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করলে তার ফল শেষ পর্যন্ত পুরো অঞ্চলকেই অস্থিতিশীল করে।

আজকের মধ্যপ্রাচ্য এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে পুরোনো নীতির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শুধুমাত্র সংঘাত নিয়ন্ত্রণ নয়, সংঘাতের মূল কারণ সমাধানের রাজনৈতিক সাহস এখন প্রয়োজন। সেই সাহসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি কার্যকর, বৈধ এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ। পথটি কঠিন, সময়সাপেক্ষ এবং রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য এর চেয়ে বাস্তবসম্মত বিকল্প এখনও বিশ্বের সামনে হাজির হয়নি।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিমান ভঙ্গিমার ব্যায়ামে বাড়ান ভারসাম্য, শক্তি ও শরীরের সৌন্দর্য

ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির একমাত্র বাস্তব পথ

০৭:০০:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বহু দশক ধরে একটি ধারণা বারবার ফিরে এসেছে—ফিলিস্তিন প্রশ্নকে আপাতত পাশে রেখে অন্য আঞ্চলিক সংকটগুলোর সমাধান করা সম্ভব। কখনও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, কখনও ইরানের প্রভাব সীমিত করা, কখনও আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ—প্রতিবারই মনে করা হয়েছে, ফিলিস্তিন ইস্যু পরে দেখা যাবে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলো আবারও প্রমাণ করেছে, এই ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। গাজার যুদ্ধ, লেবাননের অস্থিরতা, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক বিভাজন দেখিয়ে দিয়েছে যে ফিলিস্তিন প্রশ্নকে অমীমাংসিত রেখে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। সেই সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে একই সঙ্গে এটাও স্পষ্ট যে, ওয়াশিংটনের নীতিতে ফিলিস্তিন বরাবরই একটি গৌণ বিষয় হয়ে থেকেছে। যখনই শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে, তখনই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে; আলোচনা ভেঙে পড়লেই আবার সেটি অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে হারিয়ে গেছে। এই ওঠানামার রাজনীতি শুধু কূটনৈতিক ব্যর্থতাই তৈরি করেনি, বরং ফিলিস্তিনি সমাজে হতাশা, অবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক চরমপন্থার জন্যও উর্বর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

ইতিহাস দেখায়, কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা কখনও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি। দুই দশক আগে পশ্চিম তীরে প্রশাসনিক সংস্কার, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যখন অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা মনে করেছিল ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্য ছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিশ্বাস জন্মেছিল যে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বাধীন রাষ্ট্রের দিকে এগোনো সম্ভব।

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে ডেস্ট্রয়ার নিয়ে যোগ দিল যুক্তরাষ্ট্র

কিন্তু এই অগ্রগতি স্থায়ী হয়নি। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতা, দুর্নীতি, নির্বাচনী স্থবিরতা এবং সবচেয়ে বড় কথা, ইসরায়েলি নীতির পরিবর্তনের ফলে সেই সম্ভাবনা ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক ক্ষমতা সংকুচিত হওয়া এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কারণে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জনগণের চোখে ক্রমেই অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। যখন একটি সরকার নিজের কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন দিতে পারে না, রাজস্বের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকে না এবং জনগণের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, তখন তার প্রতি মানুষের আস্থা ধরে রাখা কঠিন।

এই শূন্যস্থানই চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি করে। যখন মানুষ দেখে আলোচনার মাধ্যমে কোনো পরিবর্তন আসছে না, তখন অনেকেই শক্তি প্রয়োগের পথকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। এটি শুধু রাজনৈতিক বাস্তবতা নয়; সংঘাতপূর্ণ বিশ্বের বহু অঞ্চলে একই অভিজ্ঞতা দেখা গেছে। ফলে সহিংসতা নতুন করে সহিংসতাকেই জন্ম দেয়, আর রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা আরও দূরে সরে যায়।

অনেকেই মনে করেন, হামাসকে দুর্বল করলেই সমস্যার সমাধান হবে। বাস্তবতা এত সরল নয়। কোনো একটি সংগঠনকে সামরিকভাবে দুর্বল করা সম্ভব হলেও, যে রাজনৈতিক ও সামাজিক শূন্যতা থেকে সেই সংগঠনের উত্থান ঘটে, সেটি যদি অক্ষত থাকে, তাহলে নতুন কোনো শক্তি আবার সেই জায়গা পূরণ করবে। ইতিহাসে এমন উদাহরণ অসংখ্য।

এ কারণেই ফিলিস্তিন প্রশ্নকে শুধুমাত্র নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে দেখা ভুল। এটি মূলত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, রাষ্ট্রীয় বৈধতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। যদি জনগণ বিশ্বাস করে যে তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বৈধ রাজনৈতিক পথ খোলা আছে, তাহলে সহিংসতার প্রতি সমর্থনও ধীরে ধীরে কমে আসে। আর যদি সেই পথ বন্ধ থাকে, তাহলে অস্ত্রধারী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়।

Managing Palestine's Looming Leadership Transition | International Crisis  Group

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের পুনর্গঠন। বহু বছর ধরে নির্বাচন না হওয়া, নেতৃত্বের বয়স ও অকার্যকারিতা এবং জবাবদিহির অভাব ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দুর্বল করেছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত, জবাবদিহিমূলক এবং প্রশাসনিকভাবে দক্ষ নেতৃত্ব ছাড়া কোনো রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। গণতান্ত্রিক বৈধতা শুধু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য নয়, নিজের জনগণের আস্থা অর্জনের জন্যও অপরিহার্য।

অবশ্য নির্বাচন আয়োজন করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। নির্বাচন এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ হওয়া উচিত, যেখানে বিভিন্ন মতের রাজনৈতিক শক্তি শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারে এবং সহিংসতাকে প্রত্যাখ্যান করা হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক শর্ত হিসেবে। এতে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়বে এবং চরমপন্থার আকর্ষণ কমবে।

ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে ইসরায়েলের ভূমিকাও অনিবার্য। বর্তমান বাস্তবতায় সীমান্ত, রাজস্ব, চলাচল, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তার বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। ফলে ইসরায়েলের সহযোগিতা ছাড়া কোনো কার্যকর রাষ্ট্রীয় কাঠামো দাঁড় করানো প্রায় অসম্ভব। কিন্তু সহযোগিতা মানে নিরাপত্তা উদ্বেগকে উপেক্ষা করা নয়; বরং এমন একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো তৈরি করা, যেখানে উভয় পক্ষই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার লাভ দেখতে পায়।

পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং সহিংসতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রতিটি নতুন বসতি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমঝোতার পরিসর সংকুচিত করে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে এই ধারণা জোরদার হয় যে আলোচনার মাধ্যমে তারা কিছুই অর্জন করতে পারবে না। ফলে শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা ক্রমাগত ক্ষয়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও নতুনভাবে মূল্যায়নের সময় এসেছে। ওয়াশিংটন যদি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা চায়, তাহলে তাকে শুধু যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের জন্য একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক কৌশল। এর মধ্যে থাকবে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনৈতিক সহায়তা, রাজনৈতিক পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বাস্তব রূপরেখা।

The EU's 'Geopolitical Actorness' in the Gulf: Purpose, State of Play, and  Potential - ORF Middle East

একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরব রাষ্ট্রগুলো এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদেরও আরও সমন্বিত ভূমিকা নিতে হবে। অতীতে আন্তর্জাতিক সহায়তা অনেক সময় শুধু মানবিক ত্রাণে সীমাবদ্ধ থেকেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন টেকসই প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কার্যকর সুশাসনের ভিত্তি তৈরি করা।

গাজার যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদি যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও গাজা ও পশ্চিম তীর আলাদা রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিচালিত হয়, তাহলে কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণা আরও দুর্বল হবে। তাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে একটি বৈধ, গ্রহণযোগ্য এবং একীভূত ফিলিস্তিনি প্রশাসন, যা পুরো ভূখণ্ডের প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম।

অনেকে রাষ্ট্র গঠনের ধারণাকে অবাস্তব বা অতিরিক্ত আদর্শবাদী বলে মনে করেন। কিন্তু বিকল্প কী? গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ বন্ধ রেখে শুধু সামরিক ব্যবস্থা, অবরোধ বা অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির ওপর নির্ভর করলে সংঘাত আবার ফিরে আসে। প্রতিবারই তার মানবিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক মূল্য আরও বেড়ে যায়।

শান্তি কখনও কেবল যুদ্ধ থামানোর নাম নয়। শান্তি তখনই টেকসই হয়, যখন মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং নিরাপত্তা একই সঙ্গে নিশ্চিত হয়। ফিলিস্তিন প্রশ্নেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। আত্মনিয়ন্ত্রণের বৈধ আকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করলে তার ফল শেষ পর্যন্ত পুরো অঞ্চলকেই অস্থিতিশীল করে।

আজকের মধ্যপ্রাচ্য এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে পুরোনো নীতির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শুধুমাত্র সংঘাত নিয়ন্ত্রণ নয়, সংঘাতের মূল কারণ সমাধানের রাজনৈতিক সাহস এখন প্রয়োজন। সেই সাহসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি কার্যকর, বৈধ এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ। পথটি কঠিন, সময়সাপেক্ষ এবং রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য এর চেয়ে বাস্তবসম্মত বিকল্প এখনও বিশ্বের সামনে হাজির হয়নি।