ব্রেক্সিট গণভোটের দশ বছর পূর্তি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাজ্যের রাজনীতি আবারও একটি বড় মোড়ে দাঁড়িয়ে। এই সময়ের প্রতীকী ঘটনাগুলোর একটি হলো প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ। তিনি ক্ষমতা ছাড়লেন রাজনৈতিক শালীনতা বজায় রেখেই, কিন্তু দেশের অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। এর পেছনে নানা কারণ থাকলেও, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বিচ্ছিন্ন হওয়া যে অন্যতম প্রধান কারণ, তা এখন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এক দশক আগে ব্রেক্সিটকে অনেকেই জাতীয় সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের প্রকল্প হিসেবে দেখেছিলেন। প্রতিশ্রুতি ছিল, ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে ব্রিটেন আরও স্বাধীন, আরও সমৃদ্ধ এবং আরও শক্তিশালী হবে। কিন্তু সময়ের পরীক্ষায় সেই প্রত্যাশার বড় অংশই পূরণ হয়নি। বরং অর্থনীতি, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার এবং বাণিজ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে এখন আর তেমন বিতর্ক নেই। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোও দেখাচ্ছে, ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে।
তবু আশ্চর্যের বিষয়, রাজনৈতিক নেতৃত্বের বক্তব্যে যেন সময় থমকে আছে। লন্ডন ও ব্রাসেলস—উভয় পক্ষেই এখনো পুরোনো অবস্থান আঁকড়ে থাকার প্রবণতা প্রবল। ব্রিটিশ রাজনীতিকেরা আগের সরকারের নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করতে অনাগ্রহী। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক নীতিনির্ধারকও মনে করেন, সদস্যপদের দায়িত্ব না নিয়েই ব্রিটেনকে অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া উচিত নয়। অতীতের বিরোধ, অবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক ক্ষোভ এখনো আলোচনার ওপর ছায়া ফেলছে।
কিন্তু রাজনৈতিক শ্রেণির এই অনমনীয়তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের মনোভাবের পার্থক্য দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। ব্রিটিশ জনগণের বড় অংশ এখন বিশ্বাস করে, ব্রেক্সিট দেশের বহু সমস্যাকে সহজ করেনি; বরং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অভিবাসন সংকট এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ আরও জটিল করেছে। ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার পক্ষে এখন ব্যাপক জনসমর্থন দেখা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নে পুনরায় যোগদানের ধারণাও আগের তুলনায় অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই পরিবর্তন শুধু একসময়ের ‘রিমেইন’ সমর্থকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ব্রেক্সিটের পক্ষেও ভোট দিয়েছিলেন—এমন বহু নাগরিকও এখন নতুন করে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পক্ষে।
এই পরিবর্তনের পেছনে আন্তর্জাতিক রাজনীতির দ্রুত রূপান্তরেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তন যুক্তরাষ্ট্রকে আগের মতো নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে দেখার ধারণায় নতুন প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের ভূরাজনৈতিক উত্থান ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ফলে ব্রিটেনের বহু নাগরিক এখন মনে করছেন, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতাই বেশি কার্যকর হতে পারে।
এই পরিবর্তন ব্রিটিশ দলীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। ব্রেক্সিট একসময় লেবার পার্টিকে গভীর বিভক্তির মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার প্রশ্নটি ধীরে ধীরে দলটির বিভিন্ন মতাদর্শিক অংশকে আবার কাছাকাছি নিয়ে আসছে। এমনকি যারা অতীতে লেবার ছেড়ে অন্য দলে চলে গিয়েছিলেন, তাদের বড় অংশও এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আরও গভীর সম্পর্কের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। ফলে কেবল সীমিত মাত্রার ‘রিসেট’ নয়, আরও উচ্চাভিলাষী নীতিগত পরিবর্তনের দাবিও জোরালো হচ্ছে।

পরিবর্তন শুধু ব্রিটেনে নয়, ইউরোপেও দৃশ্যমান। একসময় অনেক ইউরোপীয় নেতা ব্রেক্সিটকে অন্যদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। এখন সেই মানসিকতায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। কারণ ইউরোপও উপলব্ধি করছে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্রিটেনকে দূরে রাখা তাদের নিজেদের স্বার্থেরও পরিপন্থী হতে পারে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কৌশলগত সমন্বয়ের মতো ক্ষেত্রগুলোতে নতুন ধরনের অংশীদারিত্বের প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
এই বাস্তবতায় প্রশ্নটি আর কেবল ব্রেক্সিট সঠিক ছিল কি না, সেটি নয়। বরং মূল প্রশ্ন হলো, আগামী কয়েক দশকের জন্য ইউরোপ ও যুক্তরাজ্য কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। অতীতের রাজনৈতিক প্রতিশোধ বা আবেগ যদি ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিপরীতে, পরিবর্তিত জনমতকে গুরুত্ব দিয়ে যদি নতুন রাজনৈতিক সমঝোতার পথ খোঁজা যায়, তাহলে ব্রেক্সিট-পরবর্তী বিভাজন ইতিহাসের একটি অস্থায়ী অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে।
রাজনীতির কাজ কেবল অতীতের অবস্থান রক্ষা করা নয়; পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়াও তার দায়িত্ব। ইউরোপ আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন সংকীর্ণ দলীয় হিসাবের চেয়ে দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কত্বের প্রয়োজন অনেক বেশি। ব্রিটেন ও ইউরোপ—উভয়েরই সামনে এখন সেই সুযোগ রয়েছে। প্রশ্ন শুধু, রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি জনগণের পরিবর্তিত প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারবে?
মার্ক লিওনার্ড 


















