০৭:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬
ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির একমাত্র বাস্তব পথ তেল শোধনাগারের বাড়তি লাভের শেষ কোথায়? বাংলাদেশে হামে আরও ৩ শিশুর সন্দেহজনক মৃত্যু, মোট প্রাণহানি বেড়ে ৭৪৫ রাশিয়ার জ্বালানি দুর্বলতা, শেয়ারবাজারের বাস্তবতা এবং ইউরোপের আত্মবিশ্বাসের সংকট ব্রেক্সিটের এক দশক পরে: ব্রিটেন কি আবার ইউরোপের পথে? চাপে ইতালি-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক: ইরান ইস্যুতে মেলোনিকে ‘ভুল’ বললেন ট্রাম্প সংঘাতের গল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নায়িকা, পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমায় আসছে টিলি নরউড নাটকীয় পাঁচ সেটের লড়াই জিতে ইতিহাস গড়লেন জোকোভিচ, এবার সামনে সিনার পদ হারানোর নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়বেন মারিন ল্য পেন ন্যাটোর নজর এখন সুইডিশ প্রযুক্তিতে, ৪৫০ কোটি ডলারে কিনছে ১০টি আধুনিক আকাশ নজরদারি বিমান

তেল শোধনাগারের বাড়তি লাভের শেষ কোথায়?

  • রন বাউসো
  • ০৫:৩৯:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬
  • 1

বিশ্বের জ্বালানি বাজারে যুদ্ধ, ভূরাজনীতি এবং সরবরাহ সংকটের প্রভাব সাধারণত তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি একটি ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম তুলনামূলকভাবে কমে এসেছে, অথচ পেট্রোল, ডিজেল ও জেট জ্বালানির দাম এবং শোধনাগারগুলোর মুনাফা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এই সমীকরণ শোধনাগারগুলোর জন্য বিরল এক সুযোগ এনে দিলেও, অর্থনীতির মৌলিক নিয়ম বলছে—এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

তেল শোধনাগারের ব্যবসা মূলত দুটি বিষয়ে নির্ভর করে। প্রথমত, কত দামে তারা অপরিশোধিত তেল কিনছে; দ্বিতীয়ত, সেই তেল থেকে উৎপাদিত জ্বালানি কত দামে বিক্রি করতে পারছে। বর্তমানে এই দুই ক্ষেত্রেই তারা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কম দামে কাঁচামাল সংগ্রহের পাশাপাশি তুলনামূলক বেশি দামে জ্বালানি বিক্রি করতে পারায় তাদের লাভ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।

এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে হরমুজ প্রণালীর পুনরায় চালু হওয়া। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির পর দীর্ঘদিন আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক বাজারে একসঙ্গে প্রবেশ করতে শুরু করে। এর ফলে সরবরাহ দ্রুত বেড়ে যায় এবং কাঁচা তেলের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কমে আসে।

যুদ্ধ চলাকালে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিতে বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়েছিল। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় উপসাগরীয় অঞ্চলের বহু ট্যাংকার সমুদ্রে অপেক্ষা করছিল। যুদ্ধবিরতির পর সেই তেল বাজারে প্রবেশ করতেই পরিস্থিতি বদলে যায়। পাশাপাশি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় উৎপাদক দেশগুলোও বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে আরও প্রতিযোগিতামূলক দামে তেল বিক্রি শুরু করেছে।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম যুদ্ধকালীন সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে দ্রুত নেমে এসেছে। শুধু তাই নয়, বাস্তব বাজারে বিভিন্ন ধরনের মূল্যছাড়ও দেখা যাচ্ছে, যা শোধনাগারগুলোর উৎপাদন ব্যয় আরও কমিয়ে দিয়েছে।

তবে কাঁচা তেলের বাজারে যে স্বস্তি তৈরি হয়েছে, জ্বালানি পণ্যের বাজারে তার প্রতিফলন এখনও দেখা যায়নি। বরং উল্টো চিত্রই স্পষ্ট।

গত কয়েক মাসের সংঘাত ও সরবরাহ বিঘ্নের কারণে বিশ্বজুড়ে পেট্রোল, ডিজেল এবং বিমান জ্বালানির মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণের মৌসুম শুরু হওয়ায় পেট্রোলের চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু মজুত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। একইভাবে ইউরোপে ডিজেলের সরবরাহও চাপে রয়েছে। রাশিয়ার শোধনাগারগুলোর ওপর ধারাবাহিক হামলার কারণে দেশটির ডিজেল রপ্তানি কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

অর্থাৎ, একদিকে কাঁচা তেলের দাম কম, অন্যদিকে পরিশোধিত জ্বালানির বাজারে সংকট অব্যাহত। এই বিরল সমন্বয়ই শোধনাগারগুলোর লাভকে রেকর্ড পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অবস্থান কি টেকসই?

অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিপথ বলছে, না।

ইতিহাস বলছে, দীর্ঘ সময় ধরে কাঁচা তেলের দাম কম এবং পরিশোধিত জ্বালানির দাম বেশি—এই দুই অবস্থা একসঙ্গে টিকে থাকে না। কারণ শোধনাগারগুলো যখন বেশি মুনাফা করতে থাকে, তখন তারা আরও বেশি কাঁচা তেল কিনতে শুরু করে। এতে অপরিশোধিত তেলের চাহিদা বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত দামও ওপরে ওঠে।

অন্যদিকে, বেশি দামের কারণে বাজারে ধীরে ধীরে নতুন জ্বালানি সরবরাহ বাড়তে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মজুত পুনর্গঠিত হয় এবং জ্বালানির দামও চাপের মুখে পড়ে। ফলে বর্তমানের উচ্চ মুনাফা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসে।

এ মুহূর্তে বাজারে যে অতিরিক্ত কাঁচা তেলের সরবরাহ দেখা যাচ্ছে, সেটিও স্থায়ী নয়। যুদ্ধের সময় আটকে থাকা তেল একসময় পুরোপুরি বাজারে শোষিত হয়ে যাবে। একই সঙ্গে উৎপাদন স্বাভাবিক হওয়ার পর অতিরিক্ত সরবরাহের প্রভাবও কমতে শুরু করবে। তখন কাঁচা তেলের দাম আবার শক্তিশালী হতে পারে।

অন্যদিকে, জ্বালানির মজুত যদি পুনরুদ্ধার হয়, তাহলে পেট্রোল ও ডিজেলের বর্তমান মূল্যচাপও ধীরে ধীরে কমে আসবে। অর্থাৎ দুই দিক থেকেই শোধনাগারগুলোর বর্তমান সুবিধাজনক অবস্থান সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ কারণে আজকের রেকর্ড মুনাফাকে নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি যুদ্ধ-পরবর্তী বাজারের একটি সাময়িক অস্বাভাবিকতা, যেখানে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য এখনও পুরোপুরি ফিরে আসেনি।

বিশ্বের জ্বালানি বাজার বহুবার দেখিয়েছে, সংকটের সময় যেমন অস্বাভাবিক লাভ তৈরি হয়, তেমনি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সেই লাভও দ্রুত মিলিয়ে যায়। বর্তমানের চিত্রও সম্ভবত তার ব্যতিক্রম হবে না। আজকের এই লাভজনক সময় শোধনাগারগুলোর জন্য নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়, কিন্তু বাজারের ইতিহাস বলছে—এ ধরনের সুযোগ যত দ্রুত আসে, তত দ্রুতই শেষ হয়ে যায়।

জনপ্রিয় সংবাদ

ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির একমাত্র বাস্তব পথ

তেল শোধনাগারের বাড়তি লাভের শেষ কোথায়?

০৫:৩৯:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

বিশ্বের জ্বালানি বাজারে যুদ্ধ, ভূরাজনীতি এবং সরবরাহ সংকটের প্রভাব সাধারণত তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি একটি ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম তুলনামূলকভাবে কমে এসেছে, অথচ পেট্রোল, ডিজেল ও জেট জ্বালানির দাম এবং শোধনাগারগুলোর মুনাফা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এই সমীকরণ শোধনাগারগুলোর জন্য বিরল এক সুযোগ এনে দিলেও, অর্থনীতির মৌলিক নিয়ম বলছে—এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

তেল শোধনাগারের ব্যবসা মূলত দুটি বিষয়ে নির্ভর করে। প্রথমত, কত দামে তারা অপরিশোধিত তেল কিনছে; দ্বিতীয়ত, সেই তেল থেকে উৎপাদিত জ্বালানি কত দামে বিক্রি করতে পারছে। বর্তমানে এই দুই ক্ষেত্রেই তারা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কম দামে কাঁচামাল সংগ্রহের পাশাপাশি তুলনামূলক বেশি দামে জ্বালানি বিক্রি করতে পারায় তাদের লাভ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।

এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে হরমুজ প্রণালীর পুনরায় চালু হওয়া। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির পর দীর্ঘদিন আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক বাজারে একসঙ্গে প্রবেশ করতে শুরু করে। এর ফলে সরবরাহ দ্রুত বেড়ে যায় এবং কাঁচা তেলের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কমে আসে।

যুদ্ধ চলাকালে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিতে বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়েছিল। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় উপসাগরীয় অঞ্চলের বহু ট্যাংকার সমুদ্রে অপেক্ষা করছিল। যুদ্ধবিরতির পর সেই তেল বাজারে প্রবেশ করতেই পরিস্থিতি বদলে যায়। পাশাপাশি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় উৎপাদক দেশগুলোও বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে আরও প্রতিযোগিতামূলক দামে তেল বিক্রি শুরু করেছে।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম যুদ্ধকালীন সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে দ্রুত নেমে এসেছে। শুধু তাই নয়, বাস্তব বাজারে বিভিন্ন ধরনের মূল্যছাড়ও দেখা যাচ্ছে, যা শোধনাগারগুলোর উৎপাদন ব্যয় আরও কমিয়ে দিয়েছে।

তবে কাঁচা তেলের বাজারে যে স্বস্তি তৈরি হয়েছে, জ্বালানি পণ্যের বাজারে তার প্রতিফলন এখনও দেখা যায়নি। বরং উল্টো চিত্রই স্পষ্ট।

গত কয়েক মাসের সংঘাত ও সরবরাহ বিঘ্নের কারণে বিশ্বজুড়ে পেট্রোল, ডিজেল এবং বিমান জ্বালানির মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণের মৌসুম শুরু হওয়ায় পেট্রোলের চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু মজুত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। একইভাবে ইউরোপে ডিজেলের সরবরাহও চাপে রয়েছে। রাশিয়ার শোধনাগারগুলোর ওপর ধারাবাহিক হামলার কারণে দেশটির ডিজেল রপ্তানি কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

অর্থাৎ, একদিকে কাঁচা তেলের দাম কম, অন্যদিকে পরিশোধিত জ্বালানির বাজারে সংকট অব্যাহত। এই বিরল সমন্বয়ই শোধনাগারগুলোর লাভকে রেকর্ড পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অবস্থান কি টেকসই?

অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিপথ বলছে, না।

ইতিহাস বলছে, দীর্ঘ সময় ধরে কাঁচা তেলের দাম কম এবং পরিশোধিত জ্বালানির দাম বেশি—এই দুই অবস্থা একসঙ্গে টিকে থাকে না। কারণ শোধনাগারগুলো যখন বেশি মুনাফা করতে থাকে, তখন তারা আরও বেশি কাঁচা তেল কিনতে শুরু করে। এতে অপরিশোধিত তেলের চাহিদা বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত দামও ওপরে ওঠে।

অন্যদিকে, বেশি দামের কারণে বাজারে ধীরে ধীরে নতুন জ্বালানি সরবরাহ বাড়তে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মজুত পুনর্গঠিত হয় এবং জ্বালানির দামও চাপের মুখে পড়ে। ফলে বর্তমানের উচ্চ মুনাফা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসে।

এ মুহূর্তে বাজারে যে অতিরিক্ত কাঁচা তেলের সরবরাহ দেখা যাচ্ছে, সেটিও স্থায়ী নয়। যুদ্ধের সময় আটকে থাকা তেল একসময় পুরোপুরি বাজারে শোষিত হয়ে যাবে। একই সঙ্গে উৎপাদন স্বাভাবিক হওয়ার পর অতিরিক্ত সরবরাহের প্রভাবও কমতে শুরু করবে। তখন কাঁচা তেলের দাম আবার শক্তিশালী হতে পারে।

অন্যদিকে, জ্বালানির মজুত যদি পুনরুদ্ধার হয়, তাহলে পেট্রোল ও ডিজেলের বর্তমান মূল্যচাপও ধীরে ধীরে কমে আসবে। অর্থাৎ দুই দিক থেকেই শোধনাগারগুলোর বর্তমান সুবিধাজনক অবস্থান সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ কারণে আজকের রেকর্ড মুনাফাকে নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি যুদ্ধ-পরবর্তী বাজারের একটি সাময়িক অস্বাভাবিকতা, যেখানে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য এখনও পুরোপুরি ফিরে আসেনি।

বিশ্বের জ্বালানি বাজার বহুবার দেখিয়েছে, সংকটের সময় যেমন অস্বাভাবিক লাভ তৈরি হয়, তেমনি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সেই লাভও দ্রুত মিলিয়ে যায়। বর্তমানের চিত্রও সম্ভবত তার ব্যতিক্রম হবে না। আজকের এই লাভজনক সময় শোধনাগারগুলোর জন্য নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়, কিন্তু বাজারের ইতিহাস বলছে—এ ধরনের সুযোগ যত দ্রুত আসে, তত দ্রুতই শেষ হয়ে যায়।