০৭:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধস: মাদ্রাসায় ৫ শিক্ষার্থীর মৃত্যু, চাপা পড়ে থাকার আশঙ্কা আরও ২০ জনের ডেঙ্গুতে আরও ৩ মৃত্যু, দেশে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়াল ৭ হাজার ৫০০ প্রতিরক্ষায় বেশি ব্যয় করলেই কি ইউরোপের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে? ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির একমাত্র বাস্তব পথ তেল শোধনাগারের বাড়তি লাভের শেষ কোথায়? বাংলাদেশে হামে আরও ৩ শিশুর সন্দেহজনক মৃত্যু, মোট প্রাণহানি বেড়ে ৭৪৫ রাশিয়ার জ্বালানি দুর্বলতা, শেয়ারবাজারের বাস্তবতা এবং ইউরোপের আত্মবিশ্বাসের সংকট ব্রেক্সিটের এক দশক পরে: ব্রিটেন কি আবার ইউরোপের পথে? চাপে ইতালি-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক: ইরান ইস্যুতে মেলোনিকে ‘ভুল’ বললেন ট্রাম্প সংঘাতের গল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নায়িকা, পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমায় আসছে টিলি নরউড

প্রতিরক্ষায় বেশি ব্যয় করলেই কি ইউরোপের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে?

ইউরোপ এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে নিরাপত্তা আর কেবল কূটনীতির বিষয় নয়; এটি এখন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার প্রশ্ন। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর ইউরোপ বুঝেছে, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ছাতার নিচে থাকার যে সুবিধা ছিল, সেটি আর নিশ্চিত নয়। একই সময়ে ওয়াশিংটনের ন্যাটো-নির্ভর নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানোর দিকে ঠেলে দিয়েছে।

এই বাস্তবতায় প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক নেই। কিন্তু যে প্রশ্নটি অনেক কম আলোচিত হচ্ছে, তা হলো—এই ব্যয় কি একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিরও চালিকাশক্তি হতে পারে? অনেক রাজনৈতিক নেতা এমন ধারণা দিচ্ছেন যে সামরিক বিনিয়োগ ইউরোপের দীর্ঘদিনের দুর্বল প্রবৃদ্ধিকে নতুন গতি দিতে পারে। কিন্তু অর্থনীতির হিসাব এতটা সরল নয়।

গত এক দশকে ইউরোজোন ও যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে, সেখানে ইউরোপের অর্থনীতি বারবার স্থবিরতার মুখে পড়েছে। ফলে নতুন প্রবৃদ্ধির উৎস খোঁজার চাপ বাড়ছে। প্রতিরক্ষা ব্যয়কে সেই সমাধান হিসেবে দেখানোর প্রবণতা রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।

কোনো সরকারি ব্যয় তখনই দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে, যখন সেই ব্যয়ের বহুগুণ প্রভাব তৈরি হয়। অর্থাৎ একটি খাতে ব্যয় করা অর্থ উৎপাদন, কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন এবং বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে আরও বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করে। কিন্তু প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ক্ষেত্রে এই প্রভাব সাধারণত সীমিত।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) বিশ্লেষণ বলছে, স্বল্পমেয়াদে সামরিক ব্যয় কিছুটা প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে, বিশেষ করে যেসব দেশে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প রয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একই ব্যয় শ্রম, মূলধন ও অন্যান্য সম্পদকে আরও উৎপাদনশীল খাত থেকে সরিয়ে নিতে পারে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যায়, মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যায়নও একই ধরনের ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগের ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব থাকলেও সেটি খুব বড় নয়।

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা অনেককে আশাবাদী করে। দেশটির প্রতিরক্ষা গবেষণা থেকে ইন্টারনেট, জিপিএসসহ বহু প্রযুক্তি পরে বেসামরিক অর্থনীতিকে আমূল বদলে দিয়েছে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা ইউরোপে একইভাবে প্রয়োগ করা সহজ নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক-শিল্প অবকাঠামো, গবেষণা সক্ষমতা এবং দেশীয় উৎপাদনব্যবস্থা ইউরোপের অধিকাংশ দেশের নেই।

বরং ইউরোপের বহু দেশ তাদের সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। ফলে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়লেও সেই অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ দেশের বাইরে চলে যায়। এতে অভ্যন্তরীণ শিল্প, কর্মসংস্থান বা উৎপাদনে প্রত্যাশিত গতি তৈরি হয় না।

পোল্যান্ডের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ইউক্রেন যুদ্ধের পর দেশটি জিডিপির তুলনায় প্রতিরক্ষা ব্যয় নাটকীয়ভাবে বাড়িয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মূল্যায়নে দেখা গেছে, অর্থনীতির ওপর এর সামগ্রিক ইতিবাচক প্রভাব সীমিত ছিল। কারণ ব্যয়ের বড় অংশই আমদানিনির্ভর ছিল। একই সঙ্গে এই অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় সুদের হার বৃদ্ধির চাপও তৈরি করেছে।

অবশ্য সব ইউরোপীয় দেশের পরিস্থিতি এক নয়। ফ্রান্স ও জার্মানির মতো দেশ, যাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, তারা অতিরিক্ত সামরিক ব্যয় থেকে বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। আরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলো যৌথভাবে অস্ত্র ক্রয়, গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। তবে সেই সমন্বিত কাঠামো এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।

এদিকে নিরাপত্তার ধারণাও দ্রুত বদলাচ্ছে। আধুনিক বিশ্বে শুধু সেনাবাহিনী বা অস্ত্রই জাতীয় নিরাপত্তার একমাত্র ভিত্তি নয়। জ্বালানি নিরাপত্তাও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে।

রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর ইউরোপ যে জ্বালানি সংকটে পড়েছিল, তা এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করেছে। আবার চলতি বছরে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনাও দেখিয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ কত সহজে বিপর্যস্ত হতে পারে। যেসব দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা বহুমুখী, স্থিতিশীল ও নমনীয়, তারা এসব ধাক্কা তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে সামাল দিতে পেরেছে।

জার্মানির নতুন বাজেটে তাই প্রতিরক্ষার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো এবং জ্বালানি ব্যবস্থার উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি দেখায় যে নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্য প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবহন ও জ্বালানি খাতের কিছু বিনিয়োগ কমানোর পথ বেছে নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে দ্বৈত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ পরিচ্ছন্ন জ্বালানিভিত্তিক অর্থনীতি এখন দেশটির অন্যতম প্রবৃদ্ধির উৎস হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে প্রযুক্তি খাতের বিকাশও বাধাগ্রস্ত হবে। ইতোমধ্যেই পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ অবকাঠামোর অভাবে যুক্তরাজ্যে নতুন ডেটা সেন্টার স্থাপনের গতি কমে যাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

সব মিলিয়ে ইউরোপের জন্য প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো হয়তো সময়ের দাবি। কিন্তু সেই ব্যয় যদি অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি, গবেষণা কিংবা অন্যান্য উচ্চ উৎপাদনশীল খাতের বিনিয়োগকে সরিয়ে দেয়, তাহলে নিরাপত্তা জোরদারের চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন অপরিহার্য, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। টেকসই সমাধান তাই এমন নীতিতে নিহিত, যেখানে প্রতিরক্ষা শক্তিশালী হবে, কিন্তু অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীল সক্ষমতা তার বিনিময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। ইউরোপের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন এই দুই লক্ষ্যকে একই সঙ্গে অর্জন করা।

জনপ্রিয় সংবাদ

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধস: মাদ্রাসায় ৫ শিক্ষার্থীর মৃত্যু, চাপা পড়ে থাকার আশঙ্কা আরও ২০ জনের

প্রতিরক্ষায় বেশি ব্যয় করলেই কি ইউরোপের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে?

০৭:১২:০৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

ইউরোপ এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে নিরাপত্তা আর কেবল কূটনীতির বিষয় নয়; এটি এখন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার প্রশ্ন। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর ইউরোপ বুঝেছে, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ছাতার নিচে থাকার যে সুবিধা ছিল, সেটি আর নিশ্চিত নয়। একই সময়ে ওয়াশিংটনের ন্যাটো-নির্ভর নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানোর দিকে ঠেলে দিয়েছে।

এই বাস্তবতায় প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক নেই। কিন্তু যে প্রশ্নটি অনেক কম আলোচিত হচ্ছে, তা হলো—এই ব্যয় কি একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিরও চালিকাশক্তি হতে পারে? অনেক রাজনৈতিক নেতা এমন ধারণা দিচ্ছেন যে সামরিক বিনিয়োগ ইউরোপের দীর্ঘদিনের দুর্বল প্রবৃদ্ধিকে নতুন গতি দিতে পারে। কিন্তু অর্থনীতির হিসাব এতটা সরল নয়।

গত এক দশকে ইউরোজোন ও যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে, সেখানে ইউরোপের অর্থনীতি বারবার স্থবিরতার মুখে পড়েছে। ফলে নতুন প্রবৃদ্ধির উৎস খোঁজার চাপ বাড়ছে। প্রতিরক্ষা ব্যয়কে সেই সমাধান হিসেবে দেখানোর প্রবণতা রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।

কোনো সরকারি ব্যয় তখনই দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে, যখন সেই ব্যয়ের বহুগুণ প্রভাব তৈরি হয়। অর্থাৎ একটি খাতে ব্যয় করা অর্থ উৎপাদন, কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন এবং বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে আরও বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করে। কিন্তু প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ক্ষেত্রে এই প্রভাব সাধারণত সীমিত।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) বিশ্লেষণ বলছে, স্বল্পমেয়াদে সামরিক ব্যয় কিছুটা প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে, বিশেষ করে যেসব দেশে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প রয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একই ব্যয় শ্রম, মূলধন ও অন্যান্য সম্পদকে আরও উৎপাদনশীল খাত থেকে সরিয়ে নিতে পারে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যায়, মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যায়নও একই ধরনের ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগের ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব থাকলেও সেটি খুব বড় নয়।

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা অনেককে আশাবাদী করে। দেশটির প্রতিরক্ষা গবেষণা থেকে ইন্টারনেট, জিপিএসসহ বহু প্রযুক্তি পরে বেসামরিক অর্থনীতিকে আমূল বদলে দিয়েছে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা ইউরোপে একইভাবে প্রয়োগ করা সহজ নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক-শিল্প অবকাঠামো, গবেষণা সক্ষমতা এবং দেশীয় উৎপাদনব্যবস্থা ইউরোপের অধিকাংশ দেশের নেই।

বরং ইউরোপের বহু দেশ তাদের সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। ফলে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়লেও সেই অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ দেশের বাইরে চলে যায়। এতে অভ্যন্তরীণ শিল্প, কর্মসংস্থান বা উৎপাদনে প্রত্যাশিত গতি তৈরি হয় না।

পোল্যান্ডের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ইউক্রেন যুদ্ধের পর দেশটি জিডিপির তুলনায় প্রতিরক্ষা ব্যয় নাটকীয়ভাবে বাড়িয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মূল্যায়নে দেখা গেছে, অর্থনীতির ওপর এর সামগ্রিক ইতিবাচক প্রভাব সীমিত ছিল। কারণ ব্যয়ের বড় অংশই আমদানিনির্ভর ছিল। একই সঙ্গে এই অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় সুদের হার বৃদ্ধির চাপও তৈরি করেছে।

অবশ্য সব ইউরোপীয় দেশের পরিস্থিতি এক নয়। ফ্রান্স ও জার্মানির মতো দেশ, যাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, তারা অতিরিক্ত সামরিক ব্যয় থেকে বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। আরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলো যৌথভাবে অস্ত্র ক্রয়, গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। তবে সেই সমন্বিত কাঠামো এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।

এদিকে নিরাপত্তার ধারণাও দ্রুত বদলাচ্ছে। আধুনিক বিশ্বে শুধু সেনাবাহিনী বা অস্ত্রই জাতীয় নিরাপত্তার একমাত্র ভিত্তি নয়। জ্বালানি নিরাপত্তাও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে।

রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর ইউরোপ যে জ্বালানি সংকটে পড়েছিল, তা এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করেছে। আবার চলতি বছরে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনাও দেখিয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ কত সহজে বিপর্যস্ত হতে পারে। যেসব দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা বহুমুখী, স্থিতিশীল ও নমনীয়, তারা এসব ধাক্কা তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে সামাল দিতে পেরেছে।

জার্মানির নতুন বাজেটে তাই প্রতিরক্ষার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো এবং জ্বালানি ব্যবস্থার উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি দেখায় যে নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্য প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবহন ও জ্বালানি খাতের কিছু বিনিয়োগ কমানোর পথ বেছে নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে দ্বৈত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ পরিচ্ছন্ন জ্বালানিভিত্তিক অর্থনীতি এখন দেশটির অন্যতম প্রবৃদ্ধির উৎস হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে প্রযুক্তি খাতের বিকাশও বাধাগ্রস্ত হবে। ইতোমধ্যেই পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ অবকাঠামোর অভাবে যুক্তরাজ্যে নতুন ডেটা সেন্টার স্থাপনের গতি কমে যাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

সব মিলিয়ে ইউরোপের জন্য প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো হয়তো সময়ের দাবি। কিন্তু সেই ব্যয় যদি অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি, গবেষণা কিংবা অন্যান্য উচ্চ উৎপাদনশীল খাতের বিনিয়োগকে সরিয়ে দেয়, তাহলে নিরাপত্তা জোরদারের চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন অপরিহার্য, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। টেকসই সমাধান তাই এমন নীতিতে নিহিত, যেখানে প্রতিরক্ষা শক্তিশালী হবে, কিন্তু অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীল সক্ষমতা তার বিনিময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। ইউরোপের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন এই দুই লক্ষ্যকে একই সঙ্গে অর্জন করা।