স্মার্টফোন, স্মার্ট টিভি কিংবা অনলাইন সেবা—প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোচ্ছে, ততই অনেক প্রবীণ মানুষের কাছে এগুলো জটিল হয়ে উঠছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অর্থ এই নয় যে বয়স্করা নতুন প্রযুক্তি শিখতে অক্ষম। বরং নিয়মিত ব্যবহার কমে যাওয়া, নতুন কিছু শেখার সুযোগের অভাব এবং আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলার কারণেই তারা ধীরে ধীরে ডিজিটাল জগৎ থেকে দূরে সরে যান।
বয়সের সঙ্গে বদলে যায় শেখার ধরন
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের নতুন তথ্য দ্রুত গ্রহণ ও প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা কিছুটা কমে আসে। একই সময়ে একাধিক বিষয় সামলানো, অপরিচিত নির্দেশনা অনুসরণ করা কিংবা নতুন ডিজিটাল পদ্ধতি বুঝে নেওয়া তুলনামূলক কঠিন হয়ে পড়ে।
এ কারণেই বহু বছর আগের স্মৃতি সহজে মনে থাকলেও নতুন রিমোট কন্ট্রোল বা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারের ধাপগুলো মনে রাখা অনেক প্রবীণের জন্য কঠিন হয়ে যায়। নতুন তথ্য সংরক্ষণে বেশি সময় লাগে, তাই ধৈর্য ও অনুশীলন তাদের শেখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রযুক্তির চেয়ে বড় ভয় প্রতারণা
প্রবীণদের অনেকেই প্রযুক্তিকে নয়, বরং প্রযুক্তি ব্যবহার করতে গিয়ে ভুল হওয়া, অর্থ হারানো কিংবা প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কাকে বেশি ভয় পান। বারবার পাসওয়ার্ড ভুলে যাওয়া, হঠাৎ সফটওয়্যার পরিবর্তন কিংবা সন্দেহজনক বার্তার মুখোমুখি হওয়া তাদের আত্মবিশ্বাস আরও কমিয়ে দেয়।
এই পরিস্থিতিতে অনেকেই নতুন কিছু শেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং পরিচিত পদ্ধতিতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল দক্ষতার ব্যবধান আরও বেড়ে যায়।
পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবীণদের প্রযুক্তি শেখানোর ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের ধৈর্যশীল হওয়া জরুরি। অনেক সময় দ্রুত সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে সন্তান বা স্বজনরা নিজেরাই কাজটি করে দেন। এতে সাময়িকভাবে সমস্যা মিটলেও শেখার সুযোগ নষ্ট হয়।
বরং ধাপে ধাপে বুঝিয়ে দেওয়া, একই বিষয় বারবার অনুশীলনের সুযোগ তৈরি করা এবং ভুল করার সুযোগ দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর। এতে প্রবীণরা নিজেরাই সমস্যার সমাধান করতে শেখেন এবং আত্মবিশ্বাস ফিরে পান।
নিয়মিত ব্যবহারই বাড়ায় দক্ষতা
কর্মজীবনে থাকা মানুষেরা প্রয়োজনের তাগিদে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। কিন্তু অবসরের পর অনেক প্রবীণ বিকল্প পথ বেছে নেন। ফলে ডিজিটাল সেবার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কমে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত অনুশীলন, কৌতূহলী মানসিকতা এবং ছোট ছোট কাজ নিজে করার অভ্যাস প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে। একটি নতুন দক্ষতা আয়ত্ত করার পর পরবর্তী বিষয় শেখাও সহজ হয়ে যায়।
সহজ নকশার প্রযুক্তি সবার জন্য উপকারী
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ব্যবহারকারী নয়, প্রযুক্তির নকশাও গুরুত্বপূর্ণ। সহজ ভাষা, বড় অক্ষর, স্পষ্ট নির্দেশনা এবং কম ধাপে কাজ সম্পন্ন করার সুযোগ থাকলে প্রবীণদের জন্য প্রযুক্তি অনেক বেশি ব্যবহারবান্ধব হয়।

তাদের মতে, প্রবীণদের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা ডিজিটাল সেবা শুধু বয়স্কদের নয়, সব বয়সী মানুষের জন্যই সুবিধাজনক হয়ে ওঠে। কারণ সহজ ও পরিষ্কার নকশা সবাইকে দ্রুত কাজ শেষ করতে সহায়তা করে।
শেখানোর লক্ষ্য হওয়া উচিত স্বাধীনতা
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রযুক্তি শেখানোর উদ্দেশ্য শুধু একটি সমস্যার সমাধান নয়। বরং এমনভাবে শেখানো দরকার, যাতে ভবিষ্যতে নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেও প্রবীণরা নিজেরাই সমাধান খুঁজে নিতে পারেন।
ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস বাড়লে প্রযুক্তি আর ভয়ের বিষয় থাকে না। তখন স্মার্টফোন, ভিডিও কল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা অনলাইন সেবাগুলোও তাদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে ওঠে। আর এভাবেই ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বাস্তব অর্থে সফল হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















