বিশ্বের পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং দুর্গম আর কম পরিচিত স্থানগুলো ঘুরে দেখার স্বপ্ন থেকেই শুরু হয়েছিল তাদের যাত্রা। সেই স্বপ্ন পূরণে তিন ছোট সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে এক বছরের বিশ্বভ্রমণে বেরিয়েছে একটি পরিবার। এ অভিযানের জন্য তারা ব্যয় করছে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার। তাদের বিশ্বাস, সন্তানদের সঙ্গে কাটানো এই সময় ভবিষ্যতে আর ফিরে পাওয়া যাবে না।
সন্তানদের সঙ্গে জীবনের সবচেয়ে বড় ভ্রমণ
দম্পতির বহুদিনের ইচ্ছা ছিল সন্তানদের ছোটবেলাতেই পৃথিবীর নানা সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। বড় সন্তানের স্কুলজীবন শুরু হওয়ার আগে এটিই দীর্ঘ ভ্রমণের শেষ সুযোগ হতে পারে বলে তারা মনে করেন। তাই ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ছয়, চার ও দুই বছর বয়সী তিন সন্তানকে নিয়ে তারা বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন।
আগের জীবনে তারা ব্যাকপ্যাকার হিসেবে স্বল্প ব্যয়ে দীর্ঘ ভ্রমণ করেছিলেন। কিন্তু এবার পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে যাত্রা হওয়ায় পরিকল্পনা ও ব্যয়ের ধরন সম্পূর্ণ বদলে যায়। কয়েক বছরের সঞ্চয় থেকে পুরো ভ্রমণের অর্থ জোগাড় করা হয়।
দীর্ঘ প্রস্তুতির পর শুরু যাত্রা
ভ্রমণের প্রস্তুতি শুরু হয় প্রায় এক বছর আগে। সন্তানদের ধীরে ধীরে এই পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত করা হয়। পাশাপাশি ছোট ছোট পারিবারিক সফরের মাধ্যমে তাদের দীর্ঘ ভ্রমণের অভ্যাস গড়ে তোলা হয়।
দম্পতি নিজেরাও শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে নিয়মিত অনুশীলন করেন। কারণ পাহাড়ি পথ, দীর্ঘ ট্রেকিং, ভারী ব্যাগ বহন এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত শক্তি থাকা জরুরি ছিল। তারা প্রাথমিক চিকিৎসা ও আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণও নেন।
আরাম নয়, অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে বড় সম্পদ
বিশ্বভ্রমণে তারা বিলাসিতার চেয়ে অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাই থাকার খরচ ও খাবারের ব্যয় কমিয়ে সেই অর্থ ব্যয় করছেন বিভিন্ন অভিযান, গাইডেড ট্যুর এবং প্রকৃতিনির্ভর কর্মকাণ্ডে।
অধিকাংশ সময় তারা ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন এবং প্রতিদিনের বেশির ভাগ খাবার নিজেরাই রান্না করেন। তাদের মতে, নতুন জায়গা, নতুন মানুষ ও নতুন অভিজ্ঞতার মূল্যই সবচেয়ে বেশি।
কঠিন পথেও থেমে থাকেনি পরিবার

এ পর্যন্ত তারা মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকাসহ ১৫টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেছেন। বিশ্বের অন্যতম উষ্ণ ও দুর্গম এলাকা হিসেবে পরিচিত একটি মরু অঞ্চলেও তারা সন্তানদের নিয়ে সফলভাবে ট্রেকিং সম্পন্ন করেন। আবার আগ্নেয়গিরির পাহাড়ে দীর্ঘ হাঁটার মতো কঠিন অভিজ্ঞতাও তাদের ভ্রমণের অংশ হয়েছে।
তবে সব সময় পথ সহজ ছিল না। এক পর্যায়ে তিন সন্তান একসঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়ায় প্রায় দুই সপ্তাহ যাত্রা স্থগিত রাখতে হয়। অন্য এক দেশে ট্রেকিংয়ের ঠিক আগে বাবার পায়ে চোট লাগে। তবুও পরিকল্পনা বাতিল না করে সতর্কতার সঙ্গে ভ্রমণ চালিয়ে যান তারা।
ভ্রমণের মাঝেও চলছে কাজ
বিশ্বভ্রমণে থাকলেও দম্পতি তাদের নিজস্ব ব্যবসা বন্ধ রাখেননি। সন্তানরা ঘুমিয়ে পড়ার পর রাতেই তারা অনলাইনে কাজ করেন, গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং নিজেদের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
সময়ের পার্থক্য ও ইন্টারনেটের সীমাবদ্ধতা থাকলেও এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা আয় অব্যাহত রেখেছেন এবং দীর্ঘ ভ্রমণকে টেকসই করতে পেরেছেন।
সন্তানদের বদলে দিয়েছে এই অভিজ্ঞতা
দীর্ঘ ভ্রমণে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে শিশুদের মধ্যে। অপ্রত্যাশিত বিলম্ব, কঠিন পরিবেশ কিংবা নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে তারা দ্রুত মানিয়ে নিতে শিখেছে। দীর্ঘ বাসযাত্রা, সাধারণ পরিবেশে রাত কাটানো কিংবা কঠিন আবহাওয়া—সবকিছুই তারা ধৈর্যের সঙ্গে গ্রহণ করেছে।
পরিবারটির বিশ্বাস, এই অভিজ্ঞতা শুধু ভ্রমণ নয়, সন্তানদের আত্মবিশ্বাস, সহনশীলতা ও বাস্তবজ্ঞান গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সামনে আরও নতুন গন্তব্য
এক বছরের এই অভিযানের এখনও কয়েক মাস বাকি। আগামী সময়ে তারা দক্ষিণ আমেরিকার আরও কয়েকটি দেশ ঘুরে দেখার পরিকল্পনা করেছেন। তাদের মতে, জীবনের সবকিছু নিখুঁত হওয়ার অপেক্ষায় থাকলে অনেক স্বপ্নই অপূর্ণ থেকে যায়। তাই সুযোগ থাকতেই পরিবার নিয়ে পৃথিবীকে জানার এই সিদ্ধান্তই ছিল তাদের জীবনের অন্যতম সেরা পদক্ষেপ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















