যুক্তরাষ্ট্রে নবজাতকদের জন্য চালু হওয়া ‘ট্রাম্প অ্যাকাউন্ট’ নিয়ে শুরু থেকেই রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে। তবে বিতর্কের আড়ালে এমন একটি ধারণা উঠে এসেছে, যা ভবিষ্যতের অর্থনীতি, সম্পদ বণ্টন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নাগরিকদের আর্থিক অংশীদারিত্ব নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
এই কর্মসূচির আওতায় ২০২৫ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রতিটি যোগ্য শিশুর নামে এক হাজার ডলার যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এই অর্থ শিশুরা ১৮ বছর পূর্ণ হলে ব্যবহার করতে পারবে। এর সঙ্গে ধনী ব্যক্তি, বড় প্রতিষ্ঠান এবং অভিভাবকেরাও অতিরিক্ত অর্থ জমা দিতে পারবেন।
রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু
কর্মসূচিটি নিয়ে সবচেয়ে বড় সমালোচনা হচ্ছে, এটি কেবল ২০২৫ সালের পর জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্য প্রযোজ্য। ফলে অনেকের মতে, এটি রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট একটি উদ্যোগ। পাশাপাশি সরকারি ঋণের অর্থ ব্যবহার এবং ধনী ব্যক্তি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
তবে এসব বিতর্কের বাইরে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই দেশের অর্থনীতির অংশীদার করার ধারণাটি দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ছোট বিনিয়োগ, বড় সম্ভাবনা
বর্তমান পরিকল্পনায় এক হাজার ডলারের বিনিয়োগ ১৮ বছরে বেড়ে আনুমানিক সাড়ে চার হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে। মূল্যস্ফীতির হিসাব ধরলে এর প্রকৃত মূল্য কিছুটা কম হবে, তবুও উচ্চশিক্ষার খরচ, গাড়ি কেনা বা প্রথম বাড়ির জন্য অগ্রিম অর্থ জোগাড়ে এটি সহায়ক হতে পারে।
বর্তমানে অনেক তরুণ-তরুণী প্রথম বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে পরিবারের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সবার পরিবার সমানভাবে সক্ষম নয়। ফলে সম্পদের বৈষম্য আরও বাড়ে। নতুন এই ব্যবস্থা সেই বৈষম্য কিছুটা হলেও কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মত দেওয়া হচ্ছে।
তরুণদের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক তরুণের মধ্যে পুঁজিবাদের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া এবং সমাজতান্ত্রিক নীতির প্রতি সমর্থন বাড়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে সম্পদ পুনর্বণ্টন, মূল্যনিয়ন্ত্রণ এবং ধনীদের ওপর বেশি কর আরোপের মতো দাবির প্রতি সমর্থন বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি তরুণদের ব্যক্তিগতভাবে বেসরকারি খাত ও বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে তারা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বাজারব্যবস্থার সুফল সরাসরি অনুভব করতে পারবে। এতে বাজারভিত্তিক অর্থনীতির প্রতি আস্থা বাড়তে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নতুন প্রস্তুতি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার ভবিষ্যতে শ্রমবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের মালিকরা বিপুল সম্পদের মালিক হলেও সাধারণ কর্মীদের আয় তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়তে পারে।
এই সম্ভাব্য বৈষম্য মোকাবিলায় নাগরিকদের জন্য প্রযুক্তি ও পুঁজির ওপর সরাসরি মালিকানার সুযোগ তৈরির ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে। ভবিষ্যতে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের একটি অংশ নাগরিকদের মধ্যে একই ধরনের হিসাবের মাধ্যমে বিতরণ করা হলে তা অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে সহায়ক হতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে।
সীমাবদ্ধতা থাকলেও নজরকাড়া উদ্যোগ
এই কর্মসূচির অর্থায়ন ঋণের মাধ্যমে হওয়ায় সমালোচনা রয়েছে। তবে সমর্থকদের মতে, এই ঋণ তাৎক্ষণিক ভোগের জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও বিনিয়োগে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমান আকারে এর প্রভাব জাতীয় অর্থনীতির তুলনায় খুবই সীমিত।
সব মিলিয়ে কর্মসূচিটি নিখুঁত না হলেও শিশুদের আর্থিক শিক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় এবং ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে অংশীদারিত্বের ধারণাকে সামনে নিয়ে এসেছে। রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে এই পরীক্ষামূলক উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও পরিণত ও গ্রহণযোগ্য রূপ পেতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















