ডিমেনশিয়া এমন একটি রোগ, যা শুধু স্মৃতিশক্তিই কেড়ে নেয় না, ধীরে ধীরে একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব, আত্মপরিচয় ও স্বাভাবিক জীবনও বদলে দেয়। দীর্ঘদিন ধরে এই রোগকে বার্ধক্যের এক অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেখা হলেও সাম্প্রতিক গবেষণা নতুন আশার কথা বলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পরিচিত টিকা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। ফলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এই টিকার ব্যবহার আরও বিস্তৃত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।
বাড়ছে আশা, বদলাচ্ছে ধারণা
বিশ্বজুড়ে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিমেনশিয়া রোগীর সংখ্যাও বাড়বে বলে দীর্ঘদিন ধরে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিভিন্ন পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে।
তবে নতুন গবেষণা দেখাচ্ছে, অন্তত উন্নত দেশগুলোতে বয়সভিত্তিক হিসাব করলে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, উন্নত চিকিৎসা এবং ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার কারণে এই পরিবর্তন ঘটছে বলে মনে করা হচ্ছে।
জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পাশাপাশি টিকার বড় ভূমিকা

ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা, মানসিকভাবে সক্রিয় থাকা, উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা, শ্রবণশক্তির সমস্যা ও বিষণ্নতার চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে এসব অভ্যাস দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখা অনেকের জন্য কঠিন। এর বিপরীতে গবেষকরা বলছেন, হারপিস জোস্টার বা শিংলস প্রতিরোধের টিকা একটি তুলনামূলক সহজ এবং কার্যকর উপায় হতে পারে, যা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পর্যন্ত কমাতে সক্ষম।
কেন কাজ করতে পারে এই টিকা
এই প্রভাবের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। একটি ধারণা হলো, যে ভাইরাস চিকেনপক্স ও শিংলস সৃষ্টি করে, সেটি দীর্ঘদিন সুপ্ত অবস্থায় থেকেও স্নায়ুতন্ত্রে প্রদাহ বা ক্ষতি করতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। টিকা সেই প্রভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে।
আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, টিকা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আরও সক্রিয় করে তোলে। এর ফলে শুধু একটি ভাইরাস নয়, মস্তিষ্কের ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য জীবাণুর বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়তে পারে।
আরও মানুষের কাছে পৌঁছানো জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের জন্য এই টিকা ব্যাপকভাবে দেওয়া হলে তা শুধু শিংলস প্রতিরোধেই নয়, দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যব্যয়ও কমাতে পারে। কিন্তু অনেক দেশ এখনো সীমিত সংখ্যক মানুষের জন্য টিকাটি বরাদ্দ রাখছে, মূলত প্রাথমিক ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যে।

ফলে যাঁরা এই টিকা থেকে উপকৃত হতে পারেন, তাঁদের বড় একটি অংশ এখনো এর আওতার বাইরে রয়ে যাচ্ছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নীতি পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে।
নতুন টিকা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন
আগের গবেষণার বেশিরভাগই পুরোনো ধরনের টিকার ওপর ভিত্তি করে করা হলেও বর্তমানে নতুন প্রজন্মের টিকা বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রাথমিক তথ্য বলছে, নতুন টিকাটিও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে সমান বা আরও ভালো ফল দিতে পারে।
তবে কোন টিকা সবচেয়ে কার্যকর, কোন বয়সে নেওয়া সবচেয়ে উপযোগী এবং ভবিষ্যতে অতিরিক্ত ডোজের প্রয়োজন হবে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত গবেষণা দরকার।
প্রতিরোধই হতে পারে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ
ডিমেনশিয়ার চিকিৎসা এখনো অত্যন্ত সীমিত এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ব্যয়ও অনেক বেশি। সেই তুলনায় একটি কার্যকর টিকা শুধু ব্যক্তির জীবনমানই উন্নত করতে পারে না, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আর্থিক চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গবেষণা চললেও সম্ভাবনাময় এই প্রতিরোধমূলক উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ একটি সহজ টিকা যদি ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে, তবে সেটি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় অগ্রগতি হিসেবেই বিবেচিত হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















