কোন বয়সে একজন শিশুকে তার কাজের জন্য ফৌজদারি অপরাধী হিসেবে গণ্য করা উচিত—এই প্রশ্নটি নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশুদের জড়িত কয়েকটি আলোচিত অপরাধের পর সেই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। অনেক দেশেই ফৌজদারি দায়িত্বের সর্বনিম্ন বয়স কমানোর দাবি উঠছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জনমতের চাপে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় সামাজিক সমস্যার জন্ম দিতে পারে।
বিভিন্ন দেশে পরিবর্তনের প্রবণতা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফৌজদারি দায়িত্বের বয়স একেক রকম। কোথাও ১০ বছর, কোথাও ১৪, আবার কোথাও ১৬ বছর। সম্প্রতি কয়েকটি দেশ এই বয়সসীমা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর পেছনে রয়েছে শিশুদের জড়িত গুরুতর অপরাধ, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বিস্তার এবং জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।
নীতিনির্ধারকদের যুক্তি হলো, কঠোর আইন থাকলে অপরাধচক্র শিশুদের ব্যবহার করার প্রবণতা কমবে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, বিষয়টি এত সহজ নয়।
কেন শিশুদের ব্যবহার করে অপরাধচক্র
অপরাধচক্রের কাছে শিশুরা সহজ লক্ষ্য। তারা তুলনামূলকভাবে সহজে প্রভাবিত হয়, দ্রুত অর্থের লোভে পড়ে এবং ঝুঁকির পরিণতি সবসময় বুঝতে পারে না। একই সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে আইনি শাস্তি তুলনামূলক কম হওয়ায় অপরাধীরা ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুদের কাজে লাগায়।
মানব মস্তিষ্কের বিকাশ দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে। আত্মনিয়ন্ত্রণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পরিণতি বোঝার ক্ষমতা কিশোর বয়সে এখনও পূর্ণতা পায় না। ফলে তারা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকে।
বয়স কমালে কি অপরাধ কমে?
শুধু আইনের বয়সসীমা কমিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব—এমন প্রমাণ খুব শক্তিশালী নয়। বরং কিছু দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বয়স কমানোর পর অপরাধ কমার পরিবর্তে বেড়েছে। আবার কোথাও অপরাধচক্র আরও কমবয়সী শিশুদের ব্যবহার শুরু করেছে।
এর অর্থ হলো, আইন কঠোর করলেই সমস্যার মূল কারণ দূর হয় না। বরং অপরাধচক্র নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করে নতুন উপায় খুঁজে নেয়।
কারাগার কি শিশুদের বদলে দেয়?
অল্প বয়সে শিশুদের অপরাধী হিসেবে বিচার ও কারাগারে পাঠানোর আরেকটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা সংশোধিত হয়ে না ফিরে বরং আরও কঠোর অপরাধপ্রবণ হয়ে সমাজে ফিরে আসে। কারাগারের পরিবেশ, অপরাধীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানো এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তাদের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।
এ কারণে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, শিশুদের ক্ষেত্রে শাস্তির চেয়ে পুনর্বাসনই বেশি কার্যকর।
পুনর্বাসনই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি পথ
শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে পারিবারিক সংকট, শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্নতা, মানসিক সমস্যা, দারিদ্র্য এবং সামাজিক অবহেলার মতো নানা কারণ কাজ করে। তাই শুধু বিচার নয়, এসব কারণও মোকাবিলা করতে হবে।
প্রাথমিক পর্যায়েই ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের শনাক্ত করা, মানসিক সহায়তা দেওয়া, শিক্ষা ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং ইতিবাচক পথনির্দেশনা দেওয়া হলে অনেক শিশুকেই অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
একই সঙ্গে যারা শিশুদের অপরাধে ব্যবহার করে, সেই প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। কারণ শিশুদের অপরাধের পেছনে প্রায়ই থাকে বড়দের পরিকল্পনা ও শোষণ।
শিশুদের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎই বড় লক্ষ্য
সব ধরনের শিশু অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। তবে সমাজ যদি শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, উন্নত শিক্ষা, মানসিক সহায়তা এবং পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে অনেক শিশুই অপরাধের জগতে প্রবেশ করার আগেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবে।
শিশুদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার চেয়ে তাদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা সমাজের জন্য অনেক বেশি লাভজনক। কারণ একটি শিশুর ভবিষ্যৎ রক্ষা করা মানেই ভবিষ্যতের সমাজকে আরও নিরাপদ ও মানবিক করে তোলা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















