দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রসংগীতের ইতিহাসে আরেকটি অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। কোটি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করা কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী এস. জানকি আর নেই। শনিবার কর্ণাটকের মহীশূরে ৮৮ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এই বরেণ্য শিল্পী। শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার কারণে হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
তাঁর প্রয়াণে শুধু দক্ষিণ ভারত নয়, সমগ্র সংগীতজগত হারাল এমন এক শিল্পীকে, যার কণ্ঠের মাধুর্য, আবেগ আর সুরের গভীরতা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে।
সুরের ভুবনে এক অনন্য দীপ্তিমান নক্ষত্র
এস. জানকির নাম উচ্চারিত হলেই ভেসে ওঠে হাজারো কালজয়ী গানের স্মৃতি। তাঁর কণ্ঠে ছিল এক বিরল কোমলতা, অসাধারণ আবেগ এবং চরিত্র অনুযায়ী অনুভূতি ফুটিয়ে তোলার বিস্ময়কর ক্ষমতা। শাস্ত্রীয় সংগীত, প্রেমের গান, লোকধারার সুর, ভক্তিমূলক সংগীত কিংবা হৃদয়ছোঁয়া দ্বৈত পরিবেশনা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজের অনন্য স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
গান ছিল তাঁর আত্মার ভাষা। প্রতিটি সুরে তিনি যেন জীবনের অনুভূতিকে নতুন করে রূপ দিয়েছেন। তাঁর কণ্ঠে গাওয়া অসংখ্য গান আজও মানুষের সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা, স্মৃতি আর আবেগের সঙ্গী হয়ে বেঁচে আছে।
বহু ভাষায় ছড়িয়ে দিয়েছেন সুরের জাদু
দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি ১৮টি ভাষায় অসংখ্য গান পরিবেশন করেছেন। প্রতিটি ভাষার উচ্চারণ, আবেগ ও সুরের সৌন্দর্য তিনি এমন দক্ষতার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন যে, শ্রোতারা তাঁকে আপনজন হিসেবেই গ্রহণ করেছেন। শিশুকণ্ঠের অনুকরণ থেকে শুরু করে গভীর আবেগঘন পরিবেশনা—সব ক্ষেত্রেই ছিল তাঁর অনন্য দক্ষতা।
কর্ণাটকী শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রশিক্ষণ গ্রহণের পাশাপাশি ভক্তিমূলক সংগীতেও তিনি সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। সংগীতের প্রতি তাঁর নিবেদন এবং সাধনা তাঁকে এনে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতা।
সংগ্রাম পেরিয়ে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব পরিচয়
তামিল চলচ্চিত্রসংগীতের স্বর্ণযুগে প্রতিষ্ঠিত বহু জনপ্রিয় শিল্পীর পাশাপাশি নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন এস. জানকি। প্রতিভা, অধ্যবসায় এবং নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি এমন এক সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছান, যা আজও সংগীতাঙ্গনে বিরল।
পরবর্তীকালে প্রখ্যাত সুরকারদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ কর্মযাত্রা সৃষ্টি করেছে অগণিত কালজয়ী গান। তাঁর কণ্ঠে প্রাণ পেয়েছে অসংখ্য চলচ্চিত্রের স্মরণীয় মুহূর্ত। সংগীতপ্রেমীদের কাছে তাঁর পরিবেশিত অনেক গান আজও আবেগ, ভালোবাসা এবং স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সম্মাননা ছাপিয়ে মানুষের হৃদয়েই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন
সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি জাতীয় ও বিভিন্ন আঞ্চলিক পর্যায়ে বহু সম্মাননা অর্জন করেছেন। তবে পুরস্কারের চেয়েও বড় ছিল মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা। কয়েক দশক ধরে কোটি শ্রোতার হৃদয়ে তিনি যে স্থান তৈরি করেছিলেন, সেটিই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্বীকৃতি।
শোকাহত পরিবার, স্তব্ধ অগণিত ভক্ত
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, আপনজনদের ভালোবাসার মধ্যেই তিনি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ বিদায় নিয়েছেন। তাঁর চলে যাওয়ায় পরিবার যেমন গভীর শোকাহত, তেমনি অসংখ্য ভক্ত, শিল্পী ও শুভানুধ্যায়ীর হৃদয়েও নেমে এসেছে বিষাদের ছায়া।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে তাঁকে স্মরণ করে প্রকাশ করা হচ্ছে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। অনেকেই লিখেছেন, এস. জানকি শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাঁদের জীবনের অসংখ্য স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকবে তাঁর সুর
আন্ধ্র প্রদেশের জন্মভূমি থেকে শুরু করে দক্ষিণ ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাঁর স্মৃতি আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তামিল, তেলুগু, মালয়ালম ও কন্নড় চলচ্চিত্রসংগীতে তাঁর অবদান এক অনন্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে চিরকাল।
মানুষ চলে যায়, কিন্তু সত্যিকারের শিল্প কখনও হারিয়ে যায় না। এস. জানকির কণ্ঠও ঠিক তেমনই যুগের পর যুগ বেঁচে থাকবে মানুষের হৃদয়ে। তাঁর গাওয়া প্রতিটি গান ভবিষ্যতেও নতুন প্রজন্মকে মুগ্ধ করবে, আবেগে ভাসাবে এবং স্মরণ করিয়ে দেবে—সত্যিকারের শিল্পীর মৃত্যু হয় না, তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যেই অনন্তকাল বেঁচে থাকেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















