টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে দেশের সাত জেলার পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন। লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
সাত জেলায় বন্যার ভয়াবহতা
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার ৫৮টি উপজেলা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব এলাকায় ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১০ লাখ।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে পাহাড়ি ঢলের স্রোতে ভেসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নিহত শিশুদের মধ্যে মোহাম্মদ আশিকের বয়স ৭ বছর এবং মোহাম্মদ মিরাজের বয়স ৩ বছর। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক দিন ধরে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি পানিতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ডুবে আছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে হাজারো মানুষ
দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন মানুষ।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে গত ৪ জুলাই থেকে মৌসুমি বৃষ্টির প্রভাবে অতিবৃষ্টি শুরু হয়। এক সপ্তাহে সেখানে ১ হাজার ১৬৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমায় তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা কমেছে। তবে ফেনী, সিলেট ও উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় নদীর পানি বাড়ায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ছয় জেলার পাঁচটি নদীর সাতটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
বান্দরবানে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদী, চট্টগ্রামের দোহাজারীতে সাঙ্গু নদী, সুনামগঞ্জ ও সিলেটে কুশিয়ারা নদী, মৌলভীবাজারে মনু নদী এবং নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদীর পানি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
কেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে তিস্তা ও দেশের কয়েকটি উত্তরাঞ্চলীয় নদীর পানি বাড়তে থাকায় নতুন করে কিছু এলাকায় বন্যা দেখা দিতে পারে।

হারিয়ে গেছে ঘর, হারিয়েছে জীবিকা
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বোচরপাড়া গ্রামের আবদুল কাদেরের মাটির ঘর বন্যার পানিতে ধসে গেছে। পাঁচ কক্ষের সেই ঘরে দুই ভাইয়ের পরিবার মিলিয়ে ১৫ জন সদস্য থাকতেন।
আবদুল কাদের ও তার ভাই দুজনই দিনমজুর। হঠাৎ পানির তোড়ে ঘর ভেঙে যাওয়ায় এখন তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা জানান, অনেকেই ঘরবাড়ি হারানোর পাশাপাশি খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসার সংকটে পড়েছেন। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী ও বয়স্ক মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
ত্রাণ পৌঁছানো নিয়ে সংকট
সরকার জানিয়েছে, বন্যাকবলিত মানুষের জন্য ৬ হাজার ৯০০ টন চাল এবং ৩৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত সাত জেলার জন্য দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৬৫০ টন চাল ও ১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
তবে অনেক দুর্গত মানুষ এখনো সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। তাদের ভাষ্য, ত্রাণ বিতরণের খবর পাওয়া গেলেও প্রত্যন্ত এলাকায় অনেকের কাছে তা পৌঁছাচ্ছে না।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ত্রাণের ঘাটতির চেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সঠিক সমন্বয়। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বয়ের আহ্বান
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর সমন্বয় বাড়াতে হবে। উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রমে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিশু, বয়স্ক ও গর্ভবতী নারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















