০২:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
জুনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪৬৩, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা চট্টগ্রাম বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে ঢাকার সড়ক অবরোধ, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও চাইলেন শিক্ষার্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলায় ইরানের ছয় শহর লক্ষ্যবস্তু, উপকূলীয় সামরিক সক্ষমতায় আঘাত বিশ্ব যখন আমেরিকার ঝুঁকি কমাতে চায় অং সান সু চি কি মারা গেছেন? তিন বছরের বেশি সময়েও রহস্য কাটেনি, বাড়ছে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ‘৩৮ বছরে এলাকায় বন্যার এমন পানি দেখি নাই’ শেখ হাসিনার ‘দেশে ফেরার’ বাস্তবতা কতটা? যুক্তরাষ্ট্রে হিস্পানিকদের পরিচয় নিয়ে নতুন চিত্র, ‘আমেরিকান’ ভাবনায় বিভক্ত জনগোষ্ঠী যুক্তরাজ্যে ভয়াবহ দাবানল, ঘর ছাড়তে বাধ্য শত শত মানুষ ফাইনালের আগে ফাইনাল! বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ফ্রান্স-স্পেন মহারণ

বিশ্ব যখন আমেরিকার ঝুঁকি কমাতে চায়

দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিশ্বের অপরিহার্য শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও কূটনীতির ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করাই ছিল বহু দেশের কৌশল। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন এক প্রশ্ন সামনে এনেছে—যদি সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রটিই অনিশ্চয়তার উৎস হয়ে ওঠে, তাহলে তার মিত্ররা কী করবে?

কয়েক বছর আগে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন চীনের ওপর অতিনির্ভরতা কমানোর জন্য “ডি-রিস্কিং” ধারণা সামনে আনেন। উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিক চাপ ও কৌশলগত দুর্বলতা থেকে ইউরোপকে রক্ষা করা। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই একই ধারণা নতুন এক প্রেক্ষাপট পেয়েছে। আজ ইউরোপের অনেক রাজধানীতে আলোচনা হচ্ছে, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমানো যায়।

এটি কোনো আকস্মিক আবেগের প্রতিক্রিয়া নয়। বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন নীতির ধারাবাহিক অস্থিরতা বহু দেশকে নতুন হিসাব কষতে বাধ্য করেছে। প্রকাশ্যে তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে, কিন্তু নীরবে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, জ্বালানি ও প্রযুক্তিতে বিকল্প তৈরি করছে এবং নতুন বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অংশীদার খুঁজছে।

এই পরিবর্তনের কারণ শুধু রাজনৈতিক মতবিরোধ নয়। অনেক দেশের ধারণা, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব তখনই টেকসই হয়, যখন তা নির্ভরযোগ্যতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু যদি নীতি চার বছর পরপর নাটকীয়ভাবে বদলে যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বা নিরাপত্তা পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও ধীরে ধীরে স্বল্পমেয়াদি হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

Ursula von der Leyen: the rapid rise of the President of the European  Commission

ইউরোপে এই প্রবণতা সবচেয়ে স্পষ্ট। প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়লেও আমেরিকান অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর আলোচনা এখন আর নিষিদ্ধ বিষয় নয়। ইউরোপীয় শিল্প, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং কৌশলগত উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগকে এখন শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হিসেবে নয়, নিরাপত্তা নীতির অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

একই সময়ে এশিয়াতেও পরিবর্তনের লক্ষণ স্পষ্ট। তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ভারত—প্রত্যেকেই নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবছে। কেউ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, কেউ অস্ত্র রপ্তানিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে, আবার কেউ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা উচ্চপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিকল্প উৎস খুঁজছে। এমনকি যেসব দেশ এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিকে সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প মনে করত, তারাও এখন দেশীয় সক্ষমতা কিংবা অন্য উৎসের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে।

এ ধরনের পরিবর্তনের প্রভাব কেবল ভূরাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর অর্থনৈতিক মূল্যও রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংঘাত, বাণিজ্যিক উত্তেজনা এবং দুর্বল কূটনৈতিক সমন্বয়ের ফলে জ্বালানি ও সারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। বিদেশি শিক্ষার্থী ও পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়, সেবা খাত এবং ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারও ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিশ্বমানের প্রতিভা আকর্ষণের যে সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শক্তি ছিল, সেটিও ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মিত্র দেশগুলো এখন নিজেদের বিকল্প তৈরি করছে। কানাডা নতুন কৌশলগত অংশীদারত্বের দিকে এগোচ্ছে, ভারত বহুমুখী বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করছে, জাপান প্রতিরক্ষা নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনছে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্প বিশ্ববাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে। এসব পদক্ষেপ কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রচেষ্টা নয়; বরং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় ঝুঁকি কমানোর কৌশল।

The Debate Over the U.S. Military Role in the Gulf - AGSI

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর সব দিক নেতিবাচক নয়। ইউরোপ যদি নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ কমতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কতটা হওয়া উচিত, তা নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। এমনকি ইসরায়েলের ভেতর থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের অবাধ সামরিক সহায়তার ওপর স্থায়ী নির্ভরতার পরিবর্তে বিকল্প ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় পার্থক্য অন্য জায়গায়। আগে মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল অংশীদার ধরে পরিকল্পনা করত। এখন অনেক দেশ সম্পর্ককে চার বছরের রাজনৈতিক চক্রের মধ্যে বিবেচনা করছে। ফলে কয়েক দশকব্যাপী নিরাপত্তা, প্রযুক্তি কিংবা শিল্প বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

এই বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কেবল ভাবমূর্তির সংকট নয়; এটি কৌশলগত সক্ষমতারও প্রশ্ন। বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী অংশীদারিত্বই এতদিন যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তায় বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। সেই ভিত্তি যদি দুর্বল হয়, তবে চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে দীর্ঘ প্রতিযোগিতায় ওয়াশিংটনের অবস্থানও প্রভাবিত হবে।

তবু বিশ্ব একদিনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে—এমনটি ভাবার কারণ নেই। অধিকাংশ দেশ সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায় না; তারা বরং নির্ভরতার মাত্রা কমিয়ে বিকল্প বাড়াতে চায়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আজ আর সাদা-কালোর সরল সমীকরণে চলে না। সহযোগিতা থাকবে, প্রতিযোগিতাও থাকবে। একই সঙ্গে দেশগুলো নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতাও বাড়াবে।

সেই কারণেই পরিবর্তনটি গভীর। আগামী দিনের মার্কিন প্রশাসনকে এমন এক বিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে, যেখানে মিত্রদের প্রথম প্রশ্ন আর হবে না—আমেরিকা আমাদের জন্য কী করবে? বরং তারা জানতে চাইবে, আমেরিকার সাহায্য ছাড়াই নিজেদের কতটা শক্তিশালী করা যায়। এই মানসিক পরিবর্তনই আজকের আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা, এবং সেটি যত দ্রুত উপলব্ধি করা যাবে, ভবিষ্যতের সম্পর্ক পুনর্গঠনের সম্ভাবনাও তত বেশি থাকবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

জুনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪৬৩, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা চট্টগ্রাম বিভাগে

বিশ্ব যখন আমেরিকার ঝুঁকি কমাতে চায়

০১:৩৩:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিশ্বের অপরিহার্য শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও কূটনীতির ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করাই ছিল বহু দেশের কৌশল। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন এক প্রশ্ন সামনে এনেছে—যদি সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রটিই অনিশ্চয়তার উৎস হয়ে ওঠে, তাহলে তার মিত্ররা কী করবে?

কয়েক বছর আগে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন চীনের ওপর অতিনির্ভরতা কমানোর জন্য “ডি-রিস্কিং” ধারণা সামনে আনেন। উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিক চাপ ও কৌশলগত দুর্বলতা থেকে ইউরোপকে রক্ষা করা। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই একই ধারণা নতুন এক প্রেক্ষাপট পেয়েছে। আজ ইউরোপের অনেক রাজধানীতে আলোচনা হচ্ছে, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমানো যায়।

এটি কোনো আকস্মিক আবেগের প্রতিক্রিয়া নয়। বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন নীতির ধারাবাহিক অস্থিরতা বহু দেশকে নতুন হিসাব কষতে বাধ্য করেছে। প্রকাশ্যে তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে, কিন্তু নীরবে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, জ্বালানি ও প্রযুক্তিতে বিকল্প তৈরি করছে এবং নতুন বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অংশীদার খুঁজছে।

এই পরিবর্তনের কারণ শুধু রাজনৈতিক মতবিরোধ নয়। অনেক দেশের ধারণা, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব তখনই টেকসই হয়, যখন তা নির্ভরযোগ্যতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু যদি নীতি চার বছর পরপর নাটকীয়ভাবে বদলে যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বা নিরাপত্তা পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও ধীরে ধীরে স্বল্পমেয়াদি হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

Ursula von der Leyen: the rapid rise of the President of the European  Commission

ইউরোপে এই প্রবণতা সবচেয়ে স্পষ্ট। প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়লেও আমেরিকান অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর আলোচনা এখন আর নিষিদ্ধ বিষয় নয়। ইউরোপীয় শিল্প, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং কৌশলগত উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগকে এখন শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হিসেবে নয়, নিরাপত্তা নীতির অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

একই সময়ে এশিয়াতেও পরিবর্তনের লক্ষণ স্পষ্ট। তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ভারত—প্রত্যেকেই নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবছে। কেউ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, কেউ অস্ত্র রপ্তানিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে, আবার কেউ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা উচ্চপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিকল্প উৎস খুঁজছে। এমনকি যেসব দেশ এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিকে সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প মনে করত, তারাও এখন দেশীয় সক্ষমতা কিংবা অন্য উৎসের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে।

এ ধরনের পরিবর্তনের প্রভাব কেবল ভূরাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর অর্থনৈতিক মূল্যও রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংঘাত, বাণিজ্যিক উত্তেজনা এবং দুর্বল কূটনৈতিক সমন্বয়ের ফলে জ্বালানি ও সারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। বিদেশি শিক্ষার্থী ও পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়, সেবা খাত এবং ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারও ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিশ্বমানের প্রতিভা আকর্ষণের যে সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শক্তি ছিল, সেটিও ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মিত্র দেশগুলো এখন নিজেদের বিকল্প তৈরি করছে। কানাডা নতুন কৌশলগত অংশীদারত্বের দিকে এগোচ্ছে, ভারত বহুমুখী বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করছে, জাপান প্রতিরক্ষা নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনছে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্প বিশ্ববাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে। এসব পদক্ষেপ কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রচেষ্টা নয়; বরং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় ঝুঁকি কমানোর কৌশল।

The Debate Over the U.S. Military Role in the Gulf - AGSI

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর সব দিক নেতিবাচক নয়। ইউরোপ যদি নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ কমতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কতটা হওয়া উচিত, তা নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। এমনকি ইসরায়েলের ভেতর থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের অবাধ সামরিক সহায়তার ওপর স্থায়ী নির্ভরতার পরিবর্তে বিকল্প ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় পার্থক্য অন্য জায়গায়। আগে মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল অংশীদার ধরে পরিকল্পনা করত। এখন অনেক দেশ সম্পর্ককে চার বছরের রাজনৈতিক চক্রের মধ্যে বিবেচনা করছে। ফলে কয়েক দশকব্যাপী নিরাপত্তা, প্রযুক্তি কিংবা শিল্প বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

এই বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কেবল ভাবমূর্তির সংকট নয়; এটি কৌশলগত সক্ষমতারও প্রশ্ন। বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী অংশীদারিত্বই এতদিন যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তায় বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। সেই ভিত্তি যদি দুর্বল হয়, তবে চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে দীর্ঘ প্রতিযোগিতায় ওয়াশিংটনের অবস্থানও প্রভাবিত হবে।

তবু বিশ্ব একদিনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে—এমনটি ভাবার কারণ নেই। অধিকাংশ দেশ সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায় না; তারা বরং নির্ভরতার মাত্রা কমিয়ে বিকল্প বাড়াতে চায়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আজ আর সাদা-কালোর সরল সমীকরণে চলে না। সহযোগিতা থাকবে, প্রতিযোগিতাও থাকবে। একই সঙ্গে দেশগুলো নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতাও বাড়াবে।

সেই কারণেই পরিবর্তনটি গভীর। আগামী দিনের মার্কিন প্রশাসনকে এমন এক বিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে, যেখানে মিত্রদের প্রথম প্রশ্ন আর হবে না—আমেরিকা আমাদের জন্য কী করবে? বরং তারা জানতে চাইবে, আমেরিকার সাহায্য ছাড়াই নিজেদের কতটা শক্তিশালী করা যায়। এই মানসিক পরিবর্তনই আজকের আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা, এবং সেটি যত দ্রুত উপলব্ধি করা যাবে, ভবিষ্যতের সম্পর্ক পুনর্গঠনের সম্ভাবনাও তত বেশি থাকবে।