শিক্ষানীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ধারাবাহিকতা। আর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে নীতির বারবার বদল। কোনো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যদি প্রতিটি নতুন সরকারের সঙ্গে নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাঠে পরিণত হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম। কারণ শিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র, যার ফলাফল এক বা দুই বছরে নয়, বরং দশকজুড়ে মূল্যায়ন করতে হয়।
প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষার ব্যবহার নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক এই বৃহত্তর সমস্যারই প্রতিফলন। একটি নীতি বাস্তবায়নের কয়েক বছরের মধ্যেই সেটিকে ব্যর্থ ঘোষণা করে সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হাঁটার প্রবণতা কেবল প্রশাসনিক অস্থিরতারই পরিচয় নয়; এটি নীতিনির্ধারণে গবেষণা, মূল্যায়ন ও পেশাদার মতামতের পরিবর্তে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দেওয়ারও ইঙ্গিত দেয়।
শিশুর শেখার প্রথম ভাষা তার চিন্তার প্রথম ভাষা। সে যে ভাষায় পরিবার, সমাজ ও বাস্তবতাকে চেনে, সেই ভাষায় শিক্ষা শুরু করলে ধারণা আত্মস্থ করা সহজ হয়—এ কথা বহুদিন ধরেই শিক্ষাবিদরা বলে আসছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, শেখার ভয় কমায় এবং পরবর্তী পর্যায়ে অন্য ভাষা শেখার ভিত্তিও শক্তিশালী করে। ফলে মাতৃভাষা ও ইংরেজিকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে দেখা উচিত।
এমন একটি নীতি কার্যকর হওয়ার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক টেনে ব্যর্থতার অভিযোগ করা যুক্তিসঙ্গত নয়। যে শিশুরা মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার আওতায় এসেছে, তাদের অধিকাংশই তখনও সেই উচ্চস্তরের পরীক্ষায় পৌঁছায়নি। ফলে দুর্বল ফলাফলের জন্য এই নীতিকে দায়ী করা কার্যত কারণ ও ফলাফলের স্বাভাবিক সম্পর্ককেই অস্বীকার করার শামিল।

বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, নীতিটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক, উপযুক্ত শিক্ষাসামগ্রী এবং পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ কি নিশ্চিত করা হয়েছিল? কোনো কর্মসূচি ব্যর্থ হলে অনেক সময় নীতির চেয়ে বাস্তবায়নের দুর্বলতাই বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই মূল্যায়নের আগে প্রয়োগের মান যাচাই করাই হওয়া উচিত প্রথম কাজ।
শিক্ষানীতি নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার বিকল্প নেই। শিক্ষক, গবেষক, ভাষাবিদ, স্থানীয় প্রশাসন, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা ছাড়া বড় ধরনের পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। শিক্ষাব্যবস্থার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে একতরফা সিদ্ধান্ত সাধারণত বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং মাঠপর্যায়ে তার কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।
মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার সমর্থনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা রয়েছে। এমনকি বহু গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর পরিচিত ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা দিলে সাক্ষরতা ও গণিত শেখার দক্ষতা দ্রুত উন্নত হয়। পাশাপাশি এটি ইংরেজিসহ দ্বিতীয় ভাষা শেখার পথও সহজ করে। অর্থাৎ মাতৃভাষা ইংরেজির বিকল্প নয়; বরং ইংরেজি শিক্ষার একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন হতে পারে।
যারা মনে করেন ইংরেজিকেন্দ্রিক শিক্ষাই উন্নতির একমাত্র পথ, তাদের জন্য বিশ্বের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প কিংবা অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়া বহু দেশ নিজেদের ভাষাকেই জ্ঞানচর্চার প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য ইংরেজির গুরুত্ব অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তুলতে নিজস্ব ভাষার গুরুত্ব কোনোভাবেই কম নয়।
ঔপনিবেশিক ইতিহাসও একই শিক্ষা দেয়। বহু মানুষ শৈশবে মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করেও পরবর্তী জীবনে ইংরেজিতে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছেন। কারণ ভাষা শেখার সক্ষমতা ধাপে ধাপে বিকশিত হয়। শিশুর নিজের ভাষায় বোধগম্যতা শক্তিশালী হলে বিদেশি ভাষাও সে আরও কার্যকরভাবে আয়ত্ত করতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি সংস্কৃতি, ইতিহাস ও পরিচয়ের ধারক। প্রাথমিক শিক্ষায় স্থানীয় ভাষাকে সরিয়ে দেওয়া মানে কেবল একটি শিক্ষানীতির পরিবর্তন নয়, বরং ভাষাগত বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ওপরও চাপ সৃষ্টি করা। অনেক ছোট ভাষা ইতোমধ্যেই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এমন সময়ে সেগুলোকে শিক্ষার বাইরে ঠেলে দেওয়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিজেদের শিকড় থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুকে যত বেশি সম্ভব ভাষাগত ও বৌদ্ধিক সক্ষমতায় সমৃদ্ধ করা। একটি ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করতে আরেকটি ভাষাকে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং মাতৃভাষার শক্ত ভিতের ওপর ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার দক্ষতা গড়ে তোলাই অধিক কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পথ।
সবশেষে, ভাষা নিয়ে আবেগ কিংবা রাজনীতি নয়—প্রয়োজন তথ্য, গবেষণা এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত। শিক্ষানীতি যদি প্রতিবার ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে বদলে যায়, তবে ক্ষতি হয় শিক্ষার্থীদের, আর পিছিয়ে পড়ে দেশ। তাই প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষার প্রশ্নটি রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, পেশাদার শিক্ষাবিদদের গবেষণা, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং জাতীয় স্বার্থের আলোকে বিবেচিত হওয়াই উচিত।
জয়নাব সুলেইমান ওকিনো 


















