একটি নিরাপদ বাসস্থান মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য প্রকৃত চ্যালেঞ্জ কেবল নতুন বাড়ি নির্মাণ নয়; বরং এমন একটি আবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে যত বেশি সম্ভব পরিবার নিজস্ব সামর্থ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার মাধ্যমে একটি স্থায়ী ঠিকানার মালিক হতে পারে। এই পরিবর্তনটি কেবল নীতিগত নয়, রাষ্ট্রের ভূমিকা সম্পর্কে একটি মৌলিক পুনর্বিবেচনাও বটে।
দীর্ঘদিন ধরে বহু দেশেই আবাসন সংকটের প্রধান সমাধান হিসেবে সরকার নিজেই ঘর নির্মাণের পথ বেছে নিয়েছে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদার বাস্তবতায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে শুধুমাত্র সরকারি প্রকল্প দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের সম্পদ সীমিত, অথচ আবাসনের চাহিদা বহুগুণ বেশি। ফলে নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন আসা উচিত এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সরকার সরাসরি নির্মাতা না হয়ে পুরো আবাসন বাজারের কার্যকর সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করবে।
আবাসন সংকটের মূল কারণ প্রায়ই বাড়ির অভাব নয়, বরং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে মূল্যে বাড়ির স্বল্পতা। বাজারে নতুন ফ্ল্যাট বা বাড়ি তৈরি হলেও অধিকাংশই মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থেকে যায়। ফলে যেসব পরিবার বাস্তবে ব্যাংক ঋণ নিয়ে বাড়ি কেনার সক্ষমতা রাখে, তারাও বাধ্য হয়ে সরকারি আবাসনের জন্য আবেদন করে। এতে সামাজিক আবাসনের ওপর চাপ বাড়ে এবং যেসব পরিবার সত্যিকার অর্থেই বাজার থেকে কোনোভাবেই বাড়ি কিনতে পারে না, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সামাজিক আবাসনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সবচেয়ে অসহায় মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন বাজার কার্যকরভাবে সাশ্রয়ী আবাসন সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়, তখন একই ব্যবস্থার ওপর সব শ্রেণির মানুষের নির্ভরতা তৈরি হয়। এর ফলে দীর্ঘ অপেক্ষা, অসন্তোষ এবং সম্পদের অকার্যকর ব্যবহার—তিনটিই একসঙ্গে দেখা দেয়।
অতীতের অনেক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, শুধু মূল্যনিয়ন্ত্রণ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। যদি নিশ্চিত করা না যায় যে কম মূল্যের বাড়িগুলো সত্যিকারের প্রথমবারের ক্রেতাদের কাছেই যাচ্ছে, তবে সেই সুবিধা সহজেই বিনিয়োগকারীদের হাতে চলে যায়। তখন সাশ্রয়ী আবাসন সাধারণ পরিবারের জন্য নয়, বরং কম দামে সম্পদ সংগ্রহের একটি সুযোগে পরিণত হয়। ফলে নীতির লক্ষ্য ও বাস্তব ফলাফলের মধ্যে বড় ব্যবধান সৃষ্টি হয়।
এ কারণেই আবাসননীতিতে ক্রেতা নির্বাচনকে মূল্যনিয়ন্ত্রণের সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সীমিত মূল্যের প্রকল্পে অগ্রাধিকার পাবে প্রথমবারের মতো বাড়ি কিনতে চাওয়া পরিবার—এমন কাঠামো ছাড়া প্রকৃত অর্থে আবাসনকে নাগালের মধ্যে আনা সম্ভব নয়।
একই সঙ্গে বাড়ি কেনার পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো প্রাথমিক মূলধন বা ডাউন পেমেন্ট। মাসিক কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বহু পরিবার এই প্রাথমিক অর্থ জোগাড় করতে পারে না। তাই দীর্ঘমেয়াদি ভর্তুকির পরিবর্তে এককালীন ইকুইটি সহায়তা অনেক ক্ষেত্রেই অধিক কার্যকর হতে পারে। এতে পরিবার নিজস্ব অংশীদারিত্ব বজায় রাখে, ব্যাংক বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ঋণ দেয় এবং সরকারের আর্থিক দায়ও দীর্ঘমেয়াদে অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যায় না।
রাজধানী ও বড় শহরের বাস্তবতা আবার গ্রামীণ বা দ্বীপাঞ্চলের বাস্তবতা থেকে ভিন্ন। কোথাও জমির অভাব, কোথাও জমি আছে কিন্তু নির্মাণের অর্থ নেই। ফলে এক ধরনের নীতি দিয়ে সব অঞ্চলের সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। যেসব এলাকায় জমি সীমিত, সেখানে ব্যক্তিখাতের মাধ্যমে পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প বাড়ানো জরুরি। অন্যদিকে যেখানে মানুষের নিজস্ব জমি রয়েছে, সেখানে নির্মাণের জন্য আর্থিক সহায়তা ও সহজ ঋণই বেশি কার্যকর হতে পারে।
এখানে ব্যক্তিখাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি জমি, কর-সুবিধা, পরিকল্পনা অনুমোদন এবং নীতিগত সহায়তা দেয়, তবে বেসরকারি উন্নয়নকারীরা অনেক দ্রুত ও বৃহৎ পরিসরে আবাসন নির্মাণ করতে পারে। তবে এর বিনিময়ে তাদের ওপর স্পষ্ট সামাজিক দায়বদ্ধতাও থাকতে হবে—নির্ধারিত সংখ্যক আবাসন সাশ্রয়ী মূল্যে বিক্রি করা এবং নির্দিষ্ট যোগ্যতার ক্রেতাদের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে।
অবশ্য বাজারকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিলেই কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না। শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছাড়া যেকোনো ভালো নীতিও বিকৃত হতে পারে। তাই সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে এমন নিয়ম তৈরি করা, যা পরিবার, ঋণদাতা, উন্নয়নকারী এবং জমির মালিক—সবার স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে যে সাশ্রয়ী আবাসন ভবিষ্যতের জল্পনাকেন্দ্রিক সম্পদে পরিণত না হয়ে সত্যিকার অর্থেই পারিবারিক বসবাসের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।
একটি সফল আবাসননীতি শেষ পর্যন্ত কতগুলো ভবন নির্মিত হলো, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং বিচার হওয়া উচিত কতগুলো পরিবার নিরাপদ, স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজস্ব বাড়ির মালিক হতে পারল, সেই মানদণ্ডে। রাষ্ট্রের ভূমিকা তখন শুধু ইট-সিমেন্টের প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়; বরং এমন একটি ন্যায়সঙ্গত ও কার্যকর আবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে বাজার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং পরিবার—সবাই নিজেদের ভূমিকা পালন করতে পারে।
টেকসই আবাসন নিশ্চিত করার ভবিষ্যৎ পথ তাই আরও বেশি ঘর বানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে নিজের বাড়ির স্বপ্ন কেবল সরকারি বরাদ্দের ওপর নির্ভর করবে না; বরং একটি সুসংগঠিত, ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে অধিকাংশ পরিবার নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে পারবে।
ড. আবদুল্লা মুথথালিব 



















