বিজ্ঞান আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে একসঙ্গে দুটি বাস্তবতা কাজ করছে। একদিকে গবেষণা অর্থায়নের অনিশ্চয়তা, নীতিনির্ধারণে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার এবং গবেষকদের পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি এমন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, যা কয়েক বছর আগেও কল্পনার বিষয় ছিল। এই দুই বিপরীত শক্তির মাঝখানে মূল প্রশ্নটি প্রযুক্তি নিয়ে নয়; প্রশ্নটি মানুষকে নিয়ে। আগামী শতকের বিজ্ঞান কি যন্ত্রের হাতে পরিচালিত হবে, নাকি মানুষের কৌতূহলই তার প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে থাকবে?
বিজ্ঞানকে বোঝার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই বড় আবিষ্কারের গল্প শুনি, কিন্তু সেই আবিষ্কারের পেছনে থাকা দীর্ঘ ব্যর্থতার ইতিহাসটি খুব কম আলোচনায় আসে। বাস্তবে গবেষণার অগ্রগতি সরলরেখায় ঘটে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাফল্যের আগে আসে অসংখ্য ব্যর্থ পরীক্ষা, ভুল অনুমান এবং সংশোধনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া। একজন বিজ্ঞানী কেবল তথ্য সংগ্রহ করেন না; তিনি ব্যর্থতা থেকে শেখেন, নতুন প্রশ্ন তৈরি করেন এবং পুরোনো ধারণাকে পুনর্বিবেচনা করেন। এই ধৈর্য ও দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধানের সংস্কৃতি ছাড়া মৌলিক বিজ্ঞান কখনোই এগোতে পারে না।
এ কারণেই গবেষণার অর্থায়ন নিয়ে বর্তমান বিতর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি প্রতিটি প্রকল্পকে অল্প সময়ের মধ্যেই দৃশ্যমান ফল দেখানোর চাপ দেওয়া হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি মৌলিক গবেষণা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়বে। ইতিহাস বলে, মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক অর্জনের অনেকগুলোর পেছনেই ছিল এমন গবেষণা, যার তাৎক্ষণিক বাণিজ্যিক মূল্য ছিল না। নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জন্য বিজ্ঞানীদের এমন পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে তারা ঝুঁকি নিতে পারবেন, ব্যর্থ হতে পারবেন এবং আবার শুরু করার সুযোগ পাবেন।
একই সঙ্গে বিজ্ঞানের মূল্যায়নের পদ্ধতিও নতুন করে ভাবতে হবে। আজও গবেষকের সাফল্য অনেকাংশে নির্ধারিত হয় কতগুলো প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে বা কত অর্থের গবেষণা অনুদান তিনি পেয়েছেন, তার ভিত্তিতে। কিন্তু সংখ্যাগত সূচক সবসময় প্রকৃত বৈজ্ঞানিক প্রভাবের প্রতিফলন নয়। এমন বহু গবেষণা রয়েছে, যার গুরুত্ব প্রকাশের বহু বছর পর বোঝা যায়। আবার অনেক বহুল উদ্ধৃত গবেষণাও সমাজে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়। ফলে মূল্যায়নের কাঠামোকে আরও গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনায় আনতে হবে।
গবেষণার ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি মৌলিক পরিবর্তন ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত, দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং সরকার—এই চারটি শক্তি দীর্ঘদিন আলাদা আলাদা পথে কাজ করেছে। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ এতটাই জটিল যে একক কোনো প্রতিষ্ঠান একা এগোতে পারবে না। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, পারমাণবিক ফিউশন, উন্নত চিকিৎসা কিংবা জলবায়ুবিষয়ক গবেষণা—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ ক্রমেই অপরিহার্য হয়ে উঠছে। তবে এই সহযোগিতার মধ্যেও মৌলিক গবেষণার স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে, কারণ তাৎক্ষণিক প্রয়োগযোগ্যতার চাপ সব ধরনের জ্ঞানচর্চার জন্য উপযোগী নয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করছে। অনেকেই মনে করেন, এআই হয়তো গবেষকদের ভূমিকা কমিয়ে দেবে। বাস্তবতা সম্ভবত আরও জটিল। এআই বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ, সাহিত্য পর্যালোচনা কিংবা নির্দিষ্ট ধরনের পূর্বাভাসে অসাধারণ দক্ষ হতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞান শুধু তথ্যের সমষ্টি নয়; এটি নতুন প্রশ্ন করার ক্ষমতা। যন্ত্র অতীতের তথ্য থেকে শেখে, অথচ বিজ্ঞানী এমন প্রশ্ন তোলেন যার উত্তর এখনো কোথাও নেই। গবেষণাগারে ব্যর্থ পরীক্ষার অভিজ্ঞতা, প্রকাশ না হওয়া পর্যবেক্ষণ কিংবা তথ্যের গুণগত সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে যে অন্তর্দৃষ্টি একজন গবেষকের থাকে, তা এখনো কোনো অ্যালগরিদমের নাগালের মধ্যে নয়।
তবে এআইকে হুমকি হিসেবে নয়, সক্ষমতার বিস্তার হিসেবে দেখাই বেশি যুক্তিসঙ্গত। যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও এটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। দীর্ঘ গবেষণা প্রতিবেদন, জটিল বৈজ্ঞানিক ভাষা বা বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বিশ্লেষণকে বিভিন্ন স্তরের পাঠকের উপযোগী করে উপস্থাপন করা সম্ভব হতে পারে। এতে গবেষণা ও সমাজের মধ্যে দূরত্ব কমবে।
এই দূরত্ব কমানো এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জরুরি। বিজ্ঞান আজ কেবল গবেষণাগারের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জনআস্থা, গণতন্ত্র, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে মানুষের বিশ্বাস প্রায়ই প্রমাণের চেয়ে পরিচিত কণ্ঠস্বরের ওপর নির্ভর করে। ফলে বৈজ্ঞানিক সত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই এখন শুধু তথ্যের নয়, যোগাযোগেরও। বিভিন্ন মানুষের মূল্যবোধ, অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজন ভিন্ন হওয়ায় বিজ্ঞানকে এক ভাষায় নয়, বহু ভাষায় ব্যাখ্যা করতে হবে। কারও কাছে বিস্ময় বিজ্ঞানকে আকর্ষণীয় করে তোলে, কারও কাছে দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব উপযোগিতা। উভয় পথই গুরুত্বপূর্ণ।
স্বল্পমেয়াদে বিজ্ঞান অবশ্যই কঠিন সময় অতিক্রম করছে। অর্থায়নের সংকট, দক্ষ জনবল তৈরি, গবেষণার নতুন কাঠামো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব—সব মিলিয়ে সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে হতাশ হওয়ার কারণ কম। মানবসভ্যতার ইতিহাস দেখায়, প্রতিটি বড় বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এসেছে প্রশ্ন করার সাহস থেকে। প্রযুক্তি সেই যাত্রাকে ত্বরান্বিত করতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন করার ক্ষমতা তৈরি করতে পারে না।
শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞান কোনো যন্ত্রের প্রকল্প নয়; এটি মানুষের সৃজনশীলতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকাশ। কৌতূহল, কল্পনা এবং অজানাকে জানার আকাঙ্ক্ষা যতদিন থাকবে, ততদিন বিজ্ঞানও নতুন পথ খুঁজে নেবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই পথকে আরও বিস্তৃত করতে পারে, কিন্তু পথের দিকনির্দেশ এখনো মানুষের হাতেই থাকবে।
(রূপান্তর ও বাংলা উপস্থাপনা: সারাক্ষণ)
মূল সাক্ষাৎকার: নিল শুবিনের সঙ্গে মলি গ্যালভিন 


















