০৮:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
ইয়েলোস্টোনে বিশাল বাইসনের আক্রমণে আকাশে ছিটকে গেলেন বৃদ্ধ পর্যটক চিবুকে বাইসাইকেল, মই ও ঘর দাঁড় করিয়ে বিশ্বরেকর্ডের পথে তরুণ নরওয়ের ভয়াবহ আগুনে শতাধিক বাড়ি ধ্বংস, হেলিকপ্টারে চলছে পানি ছিটানোর অভিযান সাইক্লোস্পোরা সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, কাঁচা খাবারে সতর্কতার পরামর্শ ৫৫০ মিলিয়ন বছরের সামুদ্রিক প্রাণীতে মিলল ডানদিক পছন্দের প্রাচীনতম প্রমাণ ওপেনএআইয়ের নতুন নিয়মে কিশোরের চ্যাটজিপিটি নিষেধাজ্ঞার খবর পাবেন অভিভাবকরা ফকল্যান্ড ইস্যুতে আর্জেন্টিনার পাশে হোয়াইট হাউস, বিশ্বকাপ জয়ের পর নতুন বিতর্ক হ্যারি কেনের পর ইংল্যান্ডের ভবিষ্যৎ: বিশ্বকাপে কি আসছে ‘ফলস নাইন’ যুগ? যুদ্ধের আড়ালে যে মুখগুলো ইতিহাস বদলে দিয়েছিল হংকংয়ের ভয়াবহ তাই পো অগ্নিকাণ্ডে একাধিক ব্যর্থতা, তদন্তে উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

বোরহেস: যিনি আর্জেন্টিনার সাহিত্যকে বিশ্বের চিন্তার পরীক্ষাগারে পরিণত করেছিলেন

সাহিত্যে কিছু লেখক আছেন, যাদের গুরুত্ব কেবল তাঁদের লেখা বইয়ের সংখ্যায় নয়, বরং তাঁরা ভাষা ও চিন্তার সীমানা কতটা বদলে দিয়েছেন—সেটিতে। হোর্হে লুইস বোরহেস সেই বিরল লেখকদের একজন। তাঁর মৃত্যুর চার দশক পরও তাঁকে স্মরণ করার কারণ কেবল একটি সাহিত্যিক জীবনের সমাপ্তি নয়; বরং এমন এক বৌদ্ধিক প্রকল্পের দিকে ফিরে তাকানো, যা আর্জেন্টিনার সাহিত্যকে স্থানীয়তার গণ্ডি থেকে বের করে বিশ্বসাহিত্যের কেন্দ্রীয় আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

কোনো লেখককে বোঝার জন্য তাঁর জন্ম বা মৃত্যুর তারিখ যথেষ্ট নয়। ইতিহাস প্রায়ই তারিখকে গুরুত্ব দেয়, কিন্তু মানুষের প্রকৃত প্রভাব ক্যালেন্ডারের সীমা অতিক্রম করে। বোরহেসের ক্ষেত্রেও সেটাই সত্য। তিনি এমন এক সময়ে জন্মেছিলেন, যখন আর্জেন্টিনা বিপুল সম্পদের দেশ হলেও সেই সমৃদ্ধির সুফল সমাজের অধিকাংশ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। এক মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত এবং সাংস্কৃতিকভাবে বহুমাত্রিক পরিবারে বেড়ে ওঠা বোরহেস খুব অল্প বয়সেই বুঝেছিলেন যে সাহিত্য কোনো জাতীয় সীমানার মধ্যে বন্দি নয়।

তাঁর পারিবারিক পরিচয়ই ছিল দুই ভিন্ন সাংস্কৃতিক ধারার মিলনস্থল। বাবার কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন ইংরেজি ভাষা, ইউরোপীয় সাহিত্য এবং বিস্তৃত ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের উত্তরাধিকার। মায়ের পরিবার তাঁকে দিয়েছিল স্প্যানিশ ভাষা, আর্জেন্টিনার ইতিহাস এবং স্থানীয় ঐতিহ্যের গভীর সংযোগ। এই দুই প্রবাহের সংঘর্ষ নয়, বরং সংলাপ থেকেই জন্ম নিয়েছিল তাঁর সাহিত্য।

Argentine author Borges invaluable to West's understanding of China, says  academic - Global Times

বোরহেসের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত এখানেই যে তিনি কখনো আর্জেন্টিনার সাহিত্যকে বিচ্ছিন্ন কোনো জাতীয় প্রকল্প হিসেবে দেখেননি। আবার ইউরোপীয় সাহিত্যকেও তিনি এমন কোনো আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেননি, যার সামনে নতজানু হতে হবে। বরং তিনি দুই ধারাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন, তাদের পরস্পরের আলোয় নতুনভাবে পড়েছেন এবং এমন এক সাহিত্য নির্মাণ করেছেন, যেখানে বুয়েনোস আইরেসের একটি গলি যেমন বিশ্বসাহিত্যের অংশ হয়ে ওঠে, তেমনি ইউরোপীয় ক্লাসিকও লাতিন আমেরিকার অভিজ্ঞতার ভেতর নতুন অর্থ খুঁজে পায়।

এই সাহসই তাঁকে তাঁর সময়ের অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। সাহিত্যে মৌলিকতা নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন। তাঁর কাছে নতুন সৃষ্টি মানে সম্পূর্ণ নতুন কিছু উদ্ভাবন নয়; বরং বিদ্যমান ধারণা, ভাষা ও পাঠকে নতুন বিন্যাসে সাজানো। সেই কারণেই তিনি বিশ্বাস করতেন, কোনো পাঠ কখনো চূড়ান্ত নয়। প্রতিটি নতুন পাঠ, নতুন সময় এবং নতুন পাঠকের সঙ্গে একটি রচনা আবারও জন্ম নেয়।

বোরহেসের লেখায় পাঠকও লেখকের সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ধারণায় লেখা শেষ হওয়ার পরই প্রকৃত সাহিত্যিক যাত্রা শুরু হয়। কারণ পাঠকই একটি গ্রন্থকে নতুন অর্থ দেয়। এই ভাবনা আজকের সাহিত্যতত্ত্বে বহুল আলোচিত হলেও বোরহেস বহু আগেই সেটিকে সৃজনশীলভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন।

তাঁর আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানব্যবস্থার প্রতি অবিরাম সংশয়। বিশ্বকোষ, মানচিত্র, ইতিহাস, জীবনী, স্মৃতি কিংবা দর্শন—মানুষ বাস্তবতাকে বোঝার জন্য যে সব কাঠামো তৈরি করেছে, বোরহেস বারবার সেগুলোর সীমাবদ্ধতা দেখিয়েছেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, আমরা যাকে বাস্তব বলে মনে করি, তার বড় অংশই ভাষা, স্মৃতি ও বর্ণনার মাধ্যমে নির্মিত। ফলে বাস্তবতা কখনো একমাত্রিক নয়; বরং অসংখ্য ব্যাখ্যার সম্ভাবনায় গঠিত।

এই কারণেই তাঁর গল্পে গোলকধাঁধা, আয়না, অসীম গ্রন্থাগার কিংবা সময়ের পুনরাবৃত্তি কেবল সাহিত্যিক অলংকার নয়। এগুলো মানুষের জ্ঞান, স্মৃতি ও অস্তিত্ব সম্পর্কে গভীর দার্শনিক প্রশ্ন তোলার মাধ্যম। তিনি উত্তর দেওয়ার চেয়ে প্রশ্ন করাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর রচনার শক্তি সেখানেই—সেগুলো পাঠককে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেয় না; বরং চিন্তার নতুন দরজা খুলে দেয়।

Borges' Buenos Aires: The Imaginary City, Part 2 | CBC Radio

বোরহেসের সাহিত্যে বিদ্রূপ ও বৈপরীত্যের ব্যবহারও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, সময়ের সঙ্গে একটি বইয়ের অর্থ বদলে যায়। যে গ্রন্থ একসময় নিছক বিনোদন হিসেবে পড়া হতো, পরবর্তী যুগে সেটিই জাতীয় অহংকার, রাজনৈতিক প্রতীক কিংবা সাংস্কৃতিক বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। অর্থাৎ কোনো সাহিত্যকর্মের মূল্য তার প্রকাশের মুহূর্তে স্থির হয়ে যায় না; ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়ে সেটি নতুনভাবে পড়া হয়।

তাঁর নিজের জীবনও এই সত্যের সাক্ষ্য। আজ অনেকেই বোরহেসের নাম জানেন, কিন্তু তাঁর বই পড়েন তুলনামূলক কম। অথচ বিশ্বসাহিত্যের যে কয়েকটি গ্রন্থ বিংশ শতাব্দীর চিন্তার গতিপথ বদলে দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে তাঁর রচনাগুলোর স্থান নিঃসন্দেহে অগ্রগণ্য।

বার্ষিকী আমাদের স্মৃতিকে সংগঠিত করে, কিন্তু প্রভাবকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। কোনো লেখকের গুরুত্ব তাঁর মৃত্যুর কত বছর পূর্ণ হলো, সেটিতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁর ধারণাগুলো এখনো আমাদের চিন্তাকে কতটা নাড়া দেয়। বোরহেসের ক্ষেত্রে উত্তরটি স্পষ্ট। সময়, স্মৃতি, ভাষা, ইতিহাস এবং সত্য সম্পর্কে তিনি যে প্রশ্নগুলো তুলেছিলেন, সেগুলোর কোনোটিই আজ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি।

সম্ভবত এ কারণেই তাঁকে কেবল আর্জেন্টিনার একজন লেখক হিসেবে মনে রাখা যথেষ্ট নয়। তিনি এমন এক সাহিত্যিক, যিনি দেখিয়েছিলেন—একটি দেশের সাহিত্যও বিশ্ববুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার পরীক্ষাগার হয়ে উঠতে পারে, যদি সেখানে কৌতূহল, দুঃসাহস এবং প্রতিষ্ঠিত সত্যকে নতুন করে ভাবার সাহস থাকে। তাঁর উত্তরাধিকার আসলে কোনো নির্দিষ্ট বই বা তত্ত্ব নয়; বরং প্রশ্ন করার সেই নিরন্তর স্বাধীনতা, যা বড় সাহিত্যকে সময়ের সীমা অতিক্রম করে জীবন্ত রাখে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইয়েলোস্টোনে বিশাল বাইসনের আক্রমণে আকাশে ছিটকে গেলেন বৃদ্ধ পর্যটক

বোরহেস: যিনি আর্জেন্টিনার সাহিত্যকে বিশ্বের চিন্তার পরীক্ষাগারে পরিণত করেছিলেন

০৭:০০:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

সাহিত্যে কিছু লেখক আছেন, যাদের গুরুত্ব কেবল তাঁদের লেখা বইয়ের সংখ্যায় নয়, বরং তাঁরা ভাষা ও চিন্তার সীমানা কতটা বদলে দিয়েছেন—সেটিতে। হোর্হে লুইস বোরহেস সেই বিরল লেখকদের একজন। তাঁর মৃত্যুর চার দশক পরও তাঁকে স্মরণ করার কারণ কেবল একটি সাহিত্যিক জীবনের সমাপ্তি নয়; বরং এমন এক বৌদ্ধিক প্রকল্পের দিকে ফিরে তাকানো, যা আর্জেন্টিনার সাহিত্যকে স্থানীয়তার গণ্ডি থেকে বের করে বিশ্বসাহিত্যের কেন্দ্রীয় আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

কোনো লেখককে বোঝার জন্য তাঁর জন্ম বা মৃত্যুর তারিখ যথেষ্ট নয়। ইতিহাস প্রায়ই তারিখকে গুরুত্ব দেয়, কিন্তু মানুষের প্রকৃত প্রভাব ক্যালেন্ডারের সীমা অতিক্রম করে। বোরহেসের ক্ষেত্রেও সেটাই সত্য। তিনি এমন এক সময়ে জন্মেছিলেন, যখন আর্জেন্টিনা বিপুল সম্পদের দেশ হলেও সেই সমৃদ্ধির সুফল সমাজের অধিকাংশ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। এক মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত এবং সাংস্কৃতিকভাবে বহুমাত্রিক পরিবারে বেড়ে ওঠা বোরহেস খুব অল্প বয়সেই বুঝেছিলেন যে সাহিত্য কোনো জাতীয় সীমানার মধ্যে বন্দি নয়।

তাঁর পারিবারিক পরিচয়ই ছিল দুই ভিন্ন সাংস্কৃতিক ধারার মিলনস্থল। বাবার কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন ইংরেজি ভাষা, ইউরোপীয় সাহিত্য এবং বিস্তৃত ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের উত্তরাধিকার। মায়ের পরিবার তাঁকে দিয়েছিল স্প্যানিশ ভাষা, আর্জেন্টিনার ইতিহাস এবং স্থানীয় ঐতিহ্যের গভীর সংযোগ। এই দুই প্রবাহের সংঘর্ষ নয়, বরং সংলাপ থেকেই জন্ম নিয়েছিল তাঁর সাহিত্য।

Argentine author Borges invaluable to West's understanding of China, says  academic - Global Times

বোরহেসের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত এখানেই যে তিনি কখনো আর্জেন্টিনার সাহিত্যকে বিচ্ছিন্ন কোনো জাতীয় প্রকল্প হিসেবে দেখেননি। আবার ইউরোপীয় সাহিত্যকেও তিনি এমন কোনো আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেননি, যার সামনে নতজানু হতে হবে। বরং তিনি দুই ধারাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন, তাদের পরস্পরের আলোয় নতুনভাবে পড়েছেন এবং এমন এক সাহিত্য নির্মাণ করেছেন, যেখানে বুয়েনোস আইরেসের একটি গলি যেমন বিশ্বসাহিত্যের অংশ হয়ে ওঠে, তেমনি ইউরোপীয় ক্লাসিকও লাতিন আমেরিকার অভিজ্ঞতার ভেতর নতুন অর্থ খুঁজে পায়।

এই সাহসই তাঁকে তাঁর সময়ের অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। সাহিত্যে মৌলিকতা নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন। তাঁর কাছে নতুন সৃষ্টি মানে সম্পূর্ণ নতুন কিছু উদ্ভাবন নয়; বরং বিদ্যমান ধারণা, ভাষা ও পাঠকে নতুন বিন্যাসে সাজানো। সেই কারণেই তিনি বিশ্বাস করতেন, কোনো পাঠ কখনো চূড়ান্ত নয়। প্রতিটি নতুন পাঠ, নতুন সময় এবং নতুন পাঠকের সঙ্গে একটি রচনা আবারও জন্ম নেয়।

বোরহেসের লেখায় পাঠকও লেখকের সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ধারণায় লেখা শেষ হওয়ার পরই প্রকৃত সাহিত্যিক যাত্রা শুরু হয়। কারণ পাঠকই একটি গ্রন্থকে নতুন অর্থ দেয়। এই ভাবনা আজকের সাহিত্যতত্ত্বে বহুল আলোচিত হলেও বোরহেস বহু আগেই সেটিকে সৃজনশীলভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন।

তাঁর আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানব্যবস্থার প্রতি অবিরাম সংশয়। বিশ্বকোষ, মানচিত্র, ইতিহাস, জীবনী, স্মৃতি কিংবা দর্শন—মানুষ বাস্তবতাকে বোঝার জন্য যে সব কাঠামো তৈরি করেছে, বোরহেস বারবার সেগুলোর সীমাবদ্ধতা দেখিয়েছেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, আমরা যাকে বাস্তব বলে মনে করি, তার বড় অংশই ভাষা, স্মৃতি ও বর্ণনার মাধ্যমে নির্মিত। ফলে বাস্তবতা কখনো একমাত্রিক নয়; বরং অসংখ্য ব্যাখ্যার সম্ভাবনায় গঠিত।

এই কারণেই তাঁর গল্পে গোলকধাঁধা, আয়না, অসীম গ্রন্থাগার কিংবা সময়ের পুনরাবৃত্তি কেবল সাহিত্যিক অলংকার নয়। এগুলো মানুষের জ্ঞান, স্মৃতি ও অস্তিত্ব সম্পর্কে গভীর দার্শনিক প্রশ্ন তোলার মাধ্যম। তিনি উত্তর দেওয়ার চেয়ে প্রশ্ন করাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর রচনার শক্তি সেখানেই—সেগুলো পাঠককে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেয় না; বরং চিন্তার নতুন দরজা খুলে দেয়।

Borges' Buenos Aires: The Imaginary City, Part 2 | CBC Radio

বোরহেসের সাহিত্যে বিদ্রূপ ও বৈপরীত্যের ব্যবহারও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, সময়ের সঙ্গে একটি বইয়ের অর্থ বদলে যায়। যে গ্রন্থ একসময় নিছক বিনোদন হিসেবে পড়া হতো, পরবর্তী যুগে সেটিই জাতীয় অহংকার, রাজনৈতিক প্রতীক কিংবা সাংস্কৃতিক বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। অর্থাৎ কোনো সাহিত্যকর্মের মূল্য তার প্রকাশের মুহূর্তে স্থির হয়ে যায় না; ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়ে সেটি নতুনভাবে পড়া হয়।

তাঁর নিজের জীবনও এই সত্যের সাক্ষ্য। আজ অনেকেই বোরহেসের নাম জানেন, কিন্তু তাঁর বই পড়েন তুলনামূলক কম। অথচ বিশ্বসাহিত্যের যে কয়েকটি গ্রন্থ বিংশ শতাব্দীর চিন্তার গতিপথ বদলে দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে তাঁর রচনাগুলোর স্থান নিঃসন্দেহে অগ্রগণ্য।

বার্ষিকী আমাদের স্মৃতিকে সংগঠিত করে, কিন্তু প্রভাবকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। কোনো লেখকের গুরুত্ব তাঁর মৃত্যুর কত বছর পূর্ণ হলো, সেটিতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁর ধারণাগুলো এখনো আমাদের চিন্তাকে কতটা নাড়া দেয়। বোরহেসের ক্ষেত্রে উত্তরটি স্পষ্ট। সময়, স্মৃতি, ভাষা, ইতিহাস এবং সত্য সম্পর্কে তিনি যে প্রশ্নগুলো তুলেছিলেন, সেগুলোর কোনোটিই আজ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি।

সম্ভবত এ কারণেই তাঁকে কেবল আর্জেন্টিনার একজন লেখক হিসেবে মনে রাখা যথেষ্ট নয়। তিনি এমন এক সাহিত্যিক, যিনি দেখিয়েছিলেন—একটি দেশের সাহিত্যও বিশ্ববুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার পরীক্ষাগার হয়ে উঠতে পারে, যদি সেখানে কৌতূহল, দুঃসাহস এবং প্রতিষ্ঠিত সত্যকে নতুন করে ভাবার সাহস থাকে। তাঁর উত্তরাধিকার আসলে কোনো নির্দিষ্ট বই বা তত্ত্ব নয়; বরং প্রশ্ন করার সেই নিরন্তর স্বাধীনতা, যা বড় সাহিত্যকে সময়ের সীমা অতিক্রম করে জীবন্ত রাখে।