০৯:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
সন্তানদের মুখের ভাষাঃ সমাজ ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে ছাপার মেলবন্ধনে নতুন ফ্যাশন ধারা, রঙ ও নকশার সংঘাতে নজর কাড়ছে পথের সাজ ইয়েলোস্টোনে বিশাল বাইসনের আক্রমণে আকাশে ছিটকে গেলেন বৃদ্ধ পর্যটক চিবুকে বাইসাইকেল, মই ও ঘর দাঁড় করিয়ে বিশ্বরেকর্ডের পথে তরুণ নরওয়ের ভয়াবহ আগুনে শতাধিক বাড়ি ধ্বংস, হেলিকপ্টারে চলছে পানি ছিটানোর অভিযান সাইক্লোস্পোরা সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, কাঁচা খাবারে সতর্কতার পরামর্শ ৫৫০ মিলিয়ন বছরের সামুদ্রিক প্রাণীতে মিলল ডানদিক পছন্দের প্রাচীনতম প্রমাণ ওপেনএআইয়ের নতুন নিয়মে কিশোরের চ্যাটজিপিটি নিষেধাজ্ঞার খবর পাবেন অভিভাবকরা ফকল্যান্ড ইস্যুতে আর্জেন্টিনার পাশে হোয়াইট হাউস, বিশ্বকাপ জয়ের পর নতুন বিতর্ক হ্যারি কেনের পর ইংল্যান্ডের ভবিষ্যৎ: বিশ্বকাপে কি আসছে ‘ফলস নাইন’ যুগ?

যুদ্ধের আড়ালে যে মুখগুলো ইতিহাস বদলে দিয়েছিল

যুদ্ধের ইতিহাস সাধারণত বিজয়, পরাজয়, সেনাপতি, অস্ত্র এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের গল্পে ভরা। পাঠ্যপুস্তক কিংবা স্মৃতিস্তম্ভে সবচেয়ে বেশি জায়গা পান যাঁরা যুদ্ধ করেছেন হাতে অস্ত্র নিয়ে। কিন্তু প্রতিটি যুদ্ধের আরেকটি ইতিহাসও থাকে—যেখানে বেঁচে থাকার লড়াই চলে হাসপাতালের অস্থায়ী শয্যায়, রক্তে ভেজা তাঁবুর ভেতরে, কিংবা মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের পাশে বসে থাকা নীরব কিছু মানুষের হাত ধরে। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের নার্সদের নিয়ে আয়োজিত ‘ফেসেস অব সিভিল ওয়ার নার্সেস’ প্রদর্শনী সেই প্রায় বিস্মৃত ইতিহাসকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

পেনসিলভানিয়ার ঐতিহাসিক অ্যান্ড্রু কার্নেগি ফ্রি লাইব্রেরি অ্যান্ড মিউজিক হলে আয়োজিত এই প্রদর্শনী কেবল কয়েকটি প্রতিকৃতি প্রদর্শনের উদ্যোগ নয়; এটি এমন এক স্মরণযজ্ঞ, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানবিক সাহসের সংজ্ঞা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুকে পরাজিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আহত, অসুস্থ এবং মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষকে সেবা করাও সমান সাহসের কাজ।

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের শুরুতে নারীদের যুদ্ধক্ষেত্রসংলগ্ন চিকিৎসা ব্যবস্থায় কাজ করাকে সামাজিকভাবে অনুচিত বলে বিবেচনা করা হতো। চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোকে নারীদের জন্য অনুপযুক্ত পরিবেশ মনে করা হতো। কিন্তু যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা দ্রুত সেই সামাজিক বাধাগুলো ভেঙে দেয়। হাজার হাজার নারী স্বেচ্ছায় দায়িত্ব নেন ব্যান্ডেজ বদলানো, খাবার প্রস্তুত করা, চিঠি লিখে দেওয়া, অসুস্থদের সান্ত্বনা দেওয়া এবং অনেক সময় অস্ত্রোপচারের সময় সহায়তা করার মতো কঠিন কাজের।

এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি সংখ্যার পরিবর্তে মানুষকে সামনে আনে। প্রায় ৪০ হাজার নারীর অবদানের ইতিহাসকে ২০টি প্রতিকৃতির মাধ্যমে ব্যক্তিগত গল্পে রূপ দেওয়া হয়েছে। ফলে দর্শক কেবল তথ্য জানেন না; তাঁরা মানুষের মুখ, জীবনের সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের বাস্তবতা অনুভব করতে পারেন।

ফরাসি বংশোদ্ভূত মেরি টেপে, যিনি ‘ফ্রেঞ্চ মেরি’ নামে পরিচিত ছিলেন, যুদ্ধক্ষেত্রের সবচেয়ে পরিচিত নার্সদের একজন। তিনি শুধু আহতদের সেবা করেননি, গোলাগুলির মধ্যেও অবস্থান ছেড়ে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। যুদ্ধ শেষে তাঁর জীবন দারিদ্র্যে পর্যবসিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। যুদ্ধে অসাধারণ অবদান রাখা অনেক মানুষের মতো তাঁর জীবনও বিজয়ের গল্পে শেষ হয়নি।

বেল রেনল্ডসের জীবনও একইভাবে সাহসের এক অনন্য উদাহরণ। শাইলোর ভয়াবহ যুদ্ধে তিনি দিনের পর দিন বিরামহীনভাবে আহত সৈন্যদের সেবা করেছেন। অস্ত্রোপচারে সহায়তা করার মানসিক অভিঘাত তাঁকে দীর্ঘদিন তাড়িয়ে বেড়ালেও তিনি চিকিৎসাসেবাকে নিজের পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীকালে চিকিৎসক ও রেড ক্রসের কর্মী হিসেবে কাজ করেন। যুদ্ধ তাঁর পরিচয় বদলে দিয়েছিল, কিন্তু মানবসেবার অঙ্গীকার থেকে তাঁকে সরাতে পারেনি।

এই ইতিহাসে সবচেয়ে পরিচিত নাম অবশ্যই হ্যারিয়েট টাবম্যান। দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে তিনি শুধু স্বাধীনতার প্রতীকই হননি; গৃহযুদ্ধ চলাকালে নার্স, গোয়েন্দা, পথপ্রদর্শক এবং মুক্তিকামী অভিযানের সংগঠক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর জীবন দেখায়, যুদ্ধ কখনও কখনও রাজনৈতিক সংগ্রাম, মানবাধিকার এবং মানবিক দায়িত্বকে একই সুতোয় গেঁথে দেয়।

The Faces of War: How Conflict Leaves Its Mark on the Human Visage -  Diplomatic Herald

অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলের স্যালি টম্পকিনস যুদ্ধের সম্পূর্ণ ভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধি হলেও তাঁর পরিচয়ও মূলত একজন সেবাদানকারী। আহত কনফেডারেট সৈন্যদের চিকিৎসার জন্য তিনি যে হাসপাতাল পরিচালনা করেছিলেন, তা দক্ষিণের সবচেয়ে সফল চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর একটিতে পরিণত হয়। যুদ্ধের দুই বিপরীত শিবিরে অবস্থান করেও মানবিক দায়িত্বের প্রশ্নে এই নারীরা একে অপরের কাছাকাছি এসে দাঁড়ান।

হেলেন গিলসনের গল্প আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য তুলে ধরে। এমন সময়, যখন কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্যদের প্রতি বৈষম্য ছিল স্বাভাবিক ঘটনা, তিনি তাঁদের সেবা করতে দ্বিধা করেননি। অনেকেই যেখানে দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়েছিলেন, সেখানে তিনি সহমর্মিতাকেই নিজের নৈতিক অবস্থান হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। যুদ্ধের নিষ্ঠুরতার মধ্যেও মানবিক মর্যাদার এই শিক্ষা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

রোজ বিলিংস নিজের দুর্বল স্বাস্থ্য উপেক্ষা করে নিরলসভাবে আহত সৈন্যদের সেবা করতে গিয়ে টাইফাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। কবি ওয়াল্ট হুইটম্যান তাঁকে শহীদের মর্যাদা দিয়েছিলেন। একইভাবে সিস্টার মেরি ইগনেশিয়াস ফারলি কিংবা রেবেকা পমরয়ের মতো নারীরা পদক বা খ্যাতির জন্য নয়, বরং দায়িত্ববোধ থেকে কাজ করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের পরিবারকে ব্যক্তিগত শোকের সময় সান্ত্বনা দেওয়া থেকে শুরু করে যুদ্ধাহতদের পাশে থাকা—তাঁদের ভূমিকা ছিল নিঃশব্দ কিন্তু গভীর।

এই প্রদর্শনী আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট করে। যুদ্ধক্ষেত্রে নার্সদের কাজ কেবল চিকিৎসা দেওয়া ছিল না। তাঁরা পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখেছেন, খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন সৈন্যদের হয়ে চিঠি লিখেছেন, মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের শেষ মুহূর্তে পাশে থেকেছেন। অর্থাৎ তাঁরা চিকিৎসক নন শুধু; তাঁরা ছিলেন সাহস, সহমর্মিতা এবং মানবিকতার ধারক।

অ্যান্ড্রু কার্নেগি ফ্রি লাইব্রেরিতে এই প্রদর্শনীর আয়োজন তাই কেবল অতীতকে স্মরণ করার একটি উদ্যোগ নয়। এটি দেখায়, ইতিহাস সংরক্ষণ মানে শুধু যুদ্ধজয়ের কাহিনি তুলে ধরা নয়; বরং যাঁদের অবদান দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থেকেছে, তাঁদেরও দৃশ্যমান করে তোলা। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন ইতিহাসের আলোচনায় প্রায়ই সামরিক কৌশল ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রাধান্য পায়, তখন মানবিক সেবার এই অধ্যায় নতুনভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে।

গৃহযুদ্ধের নার্সদের ইতিহাস শেষ পর্যন্ত আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়। যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য কেবল কতজন নিহত হলো বা কে জয়ী হলো, সেই হিসাব দিয়ে বোঝা যায় না। সেই মূল্য বোঝা যায় তাঁদের মুখে, যাঁরা ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও জীবনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। ইতিহাস তাঁদের নাম হয়তো অনেক দিন আড়ালে রেখেছিল, কিন্তু তাঁদের অবদান ছাড়া যুদ্ধের মানবিক ইতিহাস কখনোই পূর্ণ হতো না।

জনপ্রিয় সংবাদ

সন্তানদের মুখের ভাষাঃ সমাজ ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে

যুদ্ধের আড়ালে যে মুখগুলো ইতিহাস বদলে দিয়েছিল

০৭:৪৪:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

যুদ্ধের ইতিহাস সাধারণত বিজয়, পরাজয়, সেনাপতি, অস্ত্র এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের গল্পে ভরা। পাঠ্যপুস্তক কিংবা স্মৃতিস্তম্ভে সবচেয়ে বেশি জায়গা পান যাঁরা যুদ্ধ করেছেন হাতে অস্ত্র নিয়ে। কিন্তু প্রতিটি যুদ্ধের আরেকটি ইতিহাসও থাকে—যেখানে বেঁচে থাকার লড়াই চলে হাসপাতালের অস্থায়ী শয্যায়, রক্তে ভেজা তাঁবুর ভেতরে, কিংবা মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের পাশে বসে থাকা নীরব কিছু মানুষের হাত ধরে। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের নার্সদের নিয়ে আয়োজিত ‘ফেসেস অব সিভিল ওয়ার নার্সেস’ প্রদর্শনী সেই প্রায় বিস্মৃত ইতিহাসকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

পেনসিলভানিয়ার ঐতিহাসিক অ্যান্ড্রু কার্নেগি ফ্রি লাইব্রেরি অ্যান্ড মিউজিক হলে আয়োজিত এই প্রদর্শনী কেবল কয়েকটি প্রতিকৃতি প্রদর্শনের উদ্যোগ নয়; এটি এমন এক স্মরণযজ্ঞ, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানবিক সাহসের সংজ্ঞা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুকে পরাজিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আহত, অসুস্থ এবং মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষকে সেবা করাও সমান সাহসের কাজ।

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের শুরুতে নারীদের যুদ্ধক্ষেত্রসংলগ্ন চিকিৎসা ব্যবস্থায় কাজ করাকে সামাজিকভাবে অনুচিত বলে বিবেচনা করা হতো। চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোকে নারীদের জন্য অনুপযুক্ত পরিবেশ মনে করা হতো। কিন্তু যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা দ্রুত সেই সামাজিক বাধাগুলো ভেঙে দেয়। হাজার হাজার নারী স্বেচ্ছায় দায়িত্ব নেন ব্যান্ডেজ বদলানো, খাবার প্রস্তুত করা, চিঠি লিখে দেওয়া, অসুস্থদের সান্ত্বনা দেওয়া এবং অনেক সময় অস্ত্রোপচারের সময় সহায়তা করার মতো কঠিন কাজের।

এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি সংখ্যার পরিবর্তে মানুষকে সামনে আনে। প্রায় ৪০ হাজার নারীর অবদানের ইতিহাসকে ২০টি প্রতিকৃতির মাধ্যমে ব্যক্তিগত গল্পে রূপ দেওয়া হয়েছে। ফলে দর্শক কেবল তথ্য জানেন না; তাঁরা মানুষের মুখ, জীবনের সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের বাস্তবতা অনুভব করতে পারেন।

ফরাসি বংশোদ্ভূত মেরি টেপে, যিনি ‘ফ্রেঞ্চ মেরি’ নামে পরিচিত ছিলেন, যুদ্ধক্ষেত্রের সবচেয়ে পরিচিত নার্সদের একজন। তিনি শুধু আহতদের সেবা করেননি, গোলাগুলির মধ্যেও অবস্থান ছেড়ে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। যুদ্ধ শেষে তাঁর জীবন দারিদ্র্যে পর্যবসিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। যুদ্ধে অসাধারণ অবদান রাখা অনেক মানুষের মতো তাঁর জীবনও বিজয়ের গল্পে শেষ হয়নি।

বেল রেনল্ডসের জীবনও একইভাবে সাহসের এক অনন্য উদাহরণ। শাইলোর ভয়াবহ যুদ্ধে তিনি দিনের পর দিন বিরামহীনভাবে আহত সৈন্যদের সেবা করেছেন। অস্ত্রোপচারে সহায়তা করার মানসিক অভিঘাত তাঁকে দীর্ঘদিন তাড়িয়ে বেড়ালেও তিনি চিকিৎসাসেবাকে নিজের পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীকালে চিকিৎসক ও রেড ক্রসের কর্মী হিসেবে কাজ করেন। যুদ্ধ তাঁর পরিচয় বদলে দিয়েছিল, কিন্তু মানবসেবার অঙ্গীকার থেকে তাঁকে সরাতে পারেনি।

এই ইতিহাসে সবচেয়ে পরিচিত নাম অবশ্যই হ্যারিয়েট টাবম্যান। দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে তিনি শুধু স্বাধীনতার প্রতীকই হননি; গৃহযুদ্ধ চলাকালে নার্স, গোয়েন্দা, পথপ্রদর্শক এবং মুক্তিকামী অভিযানের সংগঠক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর জীবন দেখায়, যুদ্ধ কখনও কখনও রাজনৈতিক সংগ্রাম, মানবাধিকার এবং মানবিক দায়িত্বকে একই সুতোয় গেঁথে দেয়।

The Faces of War: How Conflict Leaves Its Mark on the Human Visage -  Diplomatic Herald

অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলের স্যালি টম্পকিনস যুদ্ধের সম্পূর্ণ ভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধি হলেও তাঁর পরিচয়ও মূলত একজন সেবাদানকারী। আহত কনফেডারেট সৈন্যদের চিকিৎসার জন্য তিনি যে হাসপাতাল পরিচালনা করেছিলেন, তা দক্ষিণের সবচেয়ে সফল চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর একটিতে পরিণত হয়। যুদ্ধের দুই বিপরীত শিবিরে অবস্থান করেও মানবিক দায়িত্বের প্রশ্নে এই নারীরা একে অপরের কাছাকাছি এসে দাঁড়ান।

হেলেন গিলসনের গল্প আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য তুলে ধরে। এমন সময়, যখন কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্যদের প্রতি বৈষম্য ছিল স্বাভাবিক ঘটনা, তিনি তাঁদের সেবা করতে দ্বিধা করেননি। অনেকেই যেখানে দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়েছিলেন, সেখানে তিনি সহমর্মিতাকেই নিজের নৈতিক অবস্থান হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। যুদ্ধের নিষ্ঠুরতার মধ্যেও মানবিক মর্যাদার এই শিক্ষা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

রোজ বিলিংস নিজের দুর্বল স্বাস্থ্য উপেক্ষা করে নিরলসভাবে আহত সৈন্যদের সেবা করতে গিয়ে টাইফাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। কবি ওয়াল্ট হুইটম্যান তাঁকে শহীদের মর্যাদা দিয়েছিলেন। একইভাবে সিস্টার মেরি ইগনেশিয়াস ফারলি কিংবা রেবেকা পমরয়ের মতো নারীরা পদক বা খ্যাতির জন্য নয়, বরং দায়িত্ববোধ থেকে কাজ করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের পরিবারকে ব্যক্তিগত শোকের সময় সান্ত্বনা দেওয়া থেকে শুরু করে যুদ্ধাহতদের পাশে থাকা—তাঁদের ভূমিকা ছিল নিঃশব্দ কিন্তু গভীর।

এই প্রদর্শনী আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট করে। যুদ্ধক্ষেত্রে নার্সদের কাজ কেবল চিকিৎসা দেওয়া ছিল না। তাঁরা পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখেছেন, খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন সৈন্যদের হয়ে চিঠি লিখেছেন, মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের শেষ মুহূর্তে পাশে থেকেছেন। অর্থাৎ তাঁরা চিকিৎসক নন শুধু; তাঁরা ছিলেন সাহস, সহমর্মিতা এবং মানবিকতার ধারক।

অ্যান্ড্রু কার্নেগি ফ্রি লাইব্রেরিতে এই প্রদর্শনীর আয়োজন তাই কেবল অতীতকে স্মরণ করার একটি উদ্যোগ নয়। এটি দেখায়, ইতিহাস সংরক্ষণ মানে শুধু যুদ্ধজয়ের কাহিনি তুলে ধরা নয়; বরং যাঁদের অবদান দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থেকেছে, তাঁদেরও দৃশ্যমান করে তোলা। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন ইতিহাসের আলোচনায় প্রায়ই সামরিক কৌশল ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রাধান্য পায়, তখন মানবিক সেবার এই অধ্যায় নতুনভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে।

গৃহযুদ্ধের নার্সদের ইতিহাস শেষ পর্যন্ত আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়। যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য কেবল কতজন নিহত হলো বা কে জয়ী হলো, সেই হিসাব দিয়ে বোঝা যায় না। সেই মূল্য বোঝা যায় তাঁদের মুখে, যাঁরা ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও জীবনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। ইতিহাস তাঁদের নাম হয়তো অনেক দিন আড়ালে রেখেছিল, কিন্তু তাঁদের অবদান ছাড়া যুদ্ধের মানবিক ইতিহাস কখনোই পূর্ণ হতো না।