বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশে হেপাটাইটিস প্রতিরোধ, পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা আরও বিস্তৃত করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য এই রোগে এখনও বিপুলসংখ্যক মানুষ সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে সোমবার প্রকাশিত এক বার্তায় ডব্লিউএইচও জানায়, হেপাটাইটিস সি-তে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের একটি।
নীরব ঘাতক হিসেবে হেপাটাইটিস
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি ভাইরাল হেপাটাইটিস বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ। প্রতি বছর প্রায় ১৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, যার প্রধান কারণ লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসার। হেপাটাইটিস বি ও সি মিলিয়ে ভাইরাল হেপাটাইটিসজনিত মোট মৃত্যুর প্রায় ৯৫ শতাংশ ঘটে। প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬ হাজার নতুন সংক্রমণ এবং সাড়ে ৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে এই দুই ভাইরাসের কারণে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে বর্তমানে আনুমানিক ৪ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ভাইরাল হেপাটাইটিসে আক্রান্ত। ২০২৪ সালে এ অঞ্চলে হেপাটাইটিস বি ও সি-এর নতুন সংক্রমণ ছিল প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার এবং একই বছরে হেপাটাইটিসজনিত মৃত্যু হয়েছে প্রায় ২ লাখ মানুষের।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, বাংলাদেশের সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সক্রিয় হেপাটাইটিস সি সংক্রমণের হার আনুমানিক ০.৬ শতাংশ। তবে রোহিঙ্গা শরণার্থীসহ ঝুঁকিপূর্ণ ও সেবাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই রোগের বোঝা আরও বেশি।
এছাড়া হেপাটাইটিস বি-তেও বাংলাদেশ উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী হেপাটাইটিস বি-জনিত মোট মৃত্যুর ৬৯ শতাংশ যে ১০টি দেশে হয়েছে, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম। অথচ হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধে কার্যকর টিকা এবং হেপাটাইটিস সি সম্পূর্ণ নিরাময়ের ওষুধ থাকা সত্ত্বেও অনেক মানুষ এসব সেবার আওতায় আসতে পারছেন না।
সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসার গুরুত্ব
বাংলাদেশে ডব্লিউএইচওর প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশিদ মোহাম্মদ বলেন, হেপাটাইটিস প্রতিরোধযোগ্য, চিকিৎসাযোগ্য এবং হেপাটাইটিস সি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। কিন্তু অনেক রোগী দেরিতে শনাক্ত হওয়া কিংবা সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে জীবনরক্ষাকারী প্রতিরোধ, পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবায় মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে বিদ্যমান সব ধরনের বাধা দ্রুত দূর করার আহ্বান জানাচ্ছে ডব্লিউএইচও।

অগ্রগতি ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ
ডব্লিউএইচওর মতে, বাংলাদেশ ২০২০-২০৩০ জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ, জন্মের পরপরই হেপাটাইটিস বি টিকাদান জোরদার, পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ এবং নীতিনির্ধারণে তথ্যভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূলে উল্লেখযোগ্য অঙ্গীকার দেখিয়েছে। ডব্লিউএইচওর কারিগরি সহায়তায় এসব উদ্যোগ ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিসকে জনস্বাস্থ্য হুমকি হিসেবে নির্মূলের জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করছে।
তবে এখনও জনসচেতনতার ঘাটতি, দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়া, সাশ্রয়ী মূল্যের পরীক্ষা ও চিকিৎসার সীমিত সুযোগ, সামাজিক কলঙ্ক, বৈষম্য এবং বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সেবার অসম প্রাপ্যতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
ডব্লিউএইচওর চার অগ্রাধিকার
এই বাধা দূর করতে ডব্লিউএইচও চারটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে। এগুলো হলো—হেপাটাইটিস বি টিকাদান এবং নিরাপদ রক্ত ও ইনজেকশন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিরোধ জোরদার করা; প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃসেবা, রক্তসেবা, এইচআইভি ও যক্ষ্মা কর্মসূচির সঙ্গে হেপাটাইটিস সেবা একীভূত করে পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো; বিশেষায়িত কেন্দ্রের বাইরে সহজীকৃত চিকিৎসা সম্প্রসারণ এবং সাশ্রয়ী পরীক্ষা ও ওষুধ নিশ্চিত করা; পাশাপাশি রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসার ফলাফল, সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
ডব্লিউএইচও বলেছে, বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস ২০২৬ এমন একটি সময়ে এসেছে, যখন কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে ভাইরাল হেপাটাইটিসকে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে নির্মূল করার সুযোগ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। প্রতিরোধ, পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবার বিস্তার ঘটাতে পারলে বাংলাদেশ বহু মানুষের জীবন রক্ষা করতে এবং ২০৩০ সালের লক্ষ্যের দিকে আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশে হেপাটাইটিস সি রোগীর সংখ্যা বিশ্বের শীর্ষ ১০-এ; ডব্লিউএইচও বলছে, প্রতিরোধ, পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণে জরুরি পদক্ষেপ না নিলে রোগের বোঝা কমানো কঠিন হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















