বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছুটা ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক—এমন ধারণা থেকেই অনেক সময় প্রবীণদের স্মৃতিভ্রংশের প্রাথমিক লক্ষণগুলো উপেক্ষিত হয়। অথচ আলঝেইমারসহ বিভিন্ন ধরনের স্মৃতিভ্রংশ এখন শুধু ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, পরিবার, কর্মজীবন ও সামগ্রিক সমাজের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে আনুমানিক সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষ আলঝেইমার রোগ বা অন্য কোনো ধরনের স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৫ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছাতে পারে। ফলে দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যার দিকে এগিয়ে যাওয়া দেশগুলোর জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
প্রবীণদের মধ্যে বাড়ছে স্মৃতিভ্রংশ
স্মৃতিভ্রংশ এমন একটি অবস্থা, যেখানে মানুষের চিন্তা, স্মৃতি, সিদ্ধান্ত নেওয়া ও দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়। আলঝেইমার রোগ স্মৃতিভ্রংশের অন্যতম প্রধান কারণ।
মালয়েশিয়ায় ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজন স্মৃতিভ্রংশে ভুগছেন বলে সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য উঠে এসেছে। দেশটিতে এ রোগীর সংখ্যা ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ২৫ হাজারে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্মৃতিভ্রংশের মোট রোগীর প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের ক্ষেত্রে আলঝেইমার একটি বড় কারণ। ৬৫ বছরের বেশি বয়সী প্রতি নয়জনের মধ্যে একজন আলঝেইমারজনিত স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত হতে পারেন।
লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই শুরু হতে পারে রোগ
আলঝেইমারের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, রোগটির পরিবর্তন অনেক সময় লক্ষণ প্রকাশের প্রায় দুই দশক আগেই শরীরে শুরু হতে পারে। প্রথম দিকে রোগীর স্মৃতিতে সামান্য সমস্যা দেখা দিলেও দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের অক্ষমতা নাও তৈরি হতে পারে।
এই পর্যায়কে হালকা জ্ঞানীয় দুর্বলতা বলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই অবস্থা থেকে স্মৃতিভ্রংশে পৌঁছাতে গড়ে তিন থেকে চার বছর সময় লাগতে পারে।
কিন্তু পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় ভুলে যাওয়াকে বয়সের স্বাভাবিক আচরণ বলে ধরে নেন। ফলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, চিকিৎসা ও সহায়তা পেতে দেরি হয়। এখানেই তৈরি হয় বড় ঝুঁকি।
রোগীর পাশাপাশি চাপে পরিবার
স্মৃতিভ্রংশের প্রভাব শুধু রোগীর ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘদিন ধরে একজন রোগীর দেখাশোনা করতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের ওপর মানসিক, শারীরিক ও আর্থিক চাপ বাড়তে থাকে।
অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের কর্মক্ষম সদস্যকে চাকরি ছেড়ে পূর্ণকালীন পরিচর্যায় যুক্ত হতে হয়। দীর্ঘমেয়াদি এই দায়িত্বের কারণে কেউ কর্মক্ষেত্রে ফিরতে পারেন না, আবার কেউ কাজের সময় কমিয়ে দিতে বাধ্য হন।
ফলে পারিবারিক আয় কমার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার ওপরও প্রভাব পড়ে। দীর্ঘদিনের পরিচর্যার চাপ থেকে পরিচর্যাকারীদের মধ্যে ক্লান্তি, উদ্বেগ ও মানসিক অবসাদও তৈরি হতে পারে।
দক্ষ পরিচর্যার অভাব বড় সমস্যা
স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত ব্যক্তির যত্ন নেওয়া সাধারণ রোগীর পরিচর্যার মতো নয়। রোগীর আচরণ, স্মৃতির পরিবর্তন, নিরাপত্তা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন বুঝে বিশেষভাবে যত্ন নিতে হয়।
কিন্তু অনেক পরিবারের সদস্যের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ থাকে না। আবার দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার জন্য পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তাও অনেক ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। ফলে পুরো দায়িত্ব পরিবারের ওপর এসে পড়ে।
হাসপাতালেও পরিস্থিতি সহজ নয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়। অনেক রোগী আবার পরীক্ষা করান না বা পরিবার তাদের সমস্যাকে বয়সজনিত পরিবর্তন ভেবে এড়িয়ে যায়।

হাসপাতালে শনাক্ত না হলে বাড়ে ঝুঁকি
স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত অনেক রোগী অন্য শারীরিক সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে গেলেও তাদের স্মৃতিভ্রংশের বিষয়টি শনাক্ত করা হয় না। আবার শনাক্ত হলেও পরবর্তী সময়ে নিয়মিত পরিচর্যা ও অনুসরণের ব্যবস্থা সবসময় পর্যাপ্ত থাকে না।
ফলে এসব রোগীর হাসপাতালে থাকার সময় দীর্ঘ হতে পারে এবং চিকিৎসার ব্যয়ও বাড়তে পারে। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর রোগীর অবস্থার অবনতি হলে আবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
এ পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা দিয়ে স্মৃতিভ্রংশ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। পরিবার, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সহায়তাকেও একই ব্যবস্থার অংশ করতে হবে।
প্রয়োজন আগেভাগে শনাক্তকরণ ও পরিবারের সহায়তা
স্মৃতিভ্রংশের ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলায় মালয়েশিয়ায় ২০২৩-২০৩০ সালের জাতীয় স্মৃতিভ্রংশ কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, সামাজিক নেতিবাচক ধারণা কমানো এবং রোগীর পরিচর্যাকারীদের আরও শক্তিশালী সহায়তা দেওয়া।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে স্বাস্থ্যকর্মী, বেসরকারি সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ একসঙ্গে কাজ করছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি করা এবং পরিচর্যাকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রবীণদের যত্নে এখনই প্রস্তুতি দরকার
বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে বিশ্বের অনেক দেশেই। তাই প্রবীণদের স্বাস্থ্যকে শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। স্মৃতিভ্রংশের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ মোকাবিলায় প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতি, সহজলভ্য পরীক্ষা, প্রশিক্ষিত পরিচর্যাকারী এবং পরিবারের জন্য সামাজিক ও আর্থিক সহায়তা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রবীণদের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া কিংবা দৈনন্দিন কাজে সমস্যা দেখা দিলে সেটিকে শুধুই বয়সের স্বাভাবিক ফল হিসেবে না দেখা। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন রোগী এবং পরিবার—দুই পক্ষের জন্যই ভবিষ্যতের পথ কিছুটা সহজ করতে পারে।
প্রবীণদের যত্ন নেওয়া কেবল পরিবারের দায়িত্ব নয়; এটি একটি দায়িত্বশীল সমাজেরও পরিচয়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি বাড়ছে। আলঝেইমারসহ এ ধরনের রোগে আগাম শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও পরিচর্যাকারীদের সহায়তা এখন সময়ের বড় দাবি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















