দিনের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খাওয়ার অভ্যাস অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত নারীদের ক্ষেত্রে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত একটি ছোট আকারের র্যান্ডমাইজড ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফলে দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন মাত্র ৮ থেকে ৯ ঘণ্টার সময়সীমার মধ্যে খাবার গ্রহণ করেছেন এবং ঘুমানোর অন্তত চার ঘণ্টা আগে খাওয়া বন্ধ করেছেন, তাদের স্মৃতি ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতায় ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে।
গবেষণার ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আমেরিকান সোসাইটি ফর নিউট্রিশনের বার্ষিক সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে।
সময়সীমা নির্ধারণ করে খাওয়ার প্রভাব
গবেষণাটি পরিচালনা করেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। তারা জানতে চেয়েছিলেন, ‘টাইম-রেস্ট্রিকটেড ইটিং’ বা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে খাবার খাওয়ার অভ্যাস ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত কি না।
আগের গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্যকর উপায়ে ওজন কমানো বার্ধক্যে স্নায়ুক্ষয়জনিত সমস্যার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে গবেষকদের মতে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার গ্রহণ করলে সেই উপকারিতা আরও বাড়তে পারে।
গবেষণায় কারা ছিলেন
এই গবেষণায় ৫০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী ৪৭ জন অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত নারী অংশ নেন। সবাইকে প্রতিদিন ৫০০ ক্যালরি কম খাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ২৬ জনকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৯ ঘণ্টার মধ্যে খাবার খেতে বলা হয়। অন্যরা স্বাভাবিক নিয়মে প্রায় ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে দিনের প্রথম ও শেষ খাবার গ্রহণ করেন।
সময়সীমা মেনে চলা দলটি সাধারণত সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে খাবার শেষ করতেন। তাদের গড় খাদ্যগ্রহণের সময় ছিল ৮.২ ঘণ্টা। অন্য দলের ক্ষেত্রে এই সময় ছিল গড়ে ১২.৩ ঘণ্টা।
ওজন কমলেও পার্থক্য ছিল মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতায়
ছয় মাস শেষে দুই দলই গড়ে ৬.৮ কেজি ওজন কমিয়েছেন। অর্থাৎ ওজন কমার ক্ষেত্রে দুই দলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়নি।
তবে যাঁরা ৯ ঘণ্টার মধ্যে খাবার গ্রহণ করেছেন, তাঁদের স্থানিক পরিকল্পনা (স্পেশাল প্ল্যানিং) এবং সমস্যা সমাধানের পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে। পাশাপাশি স্মৃতি ও শেখার সক্ষমতা মূল্যায়নের পরীক্ষায় ভুলের প্রবণতাও তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
তবে একাধিক কাজ একসঙ্গে করার সক্ষমতা বা প্রতিক্রিয়ার গতির ক্ষেত্রে দুই দলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।

কেন এমন হতে পারে
গবেষণার প্রধান গবেষক ও রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সু শ্যাপস বলেন, শুধু ওজন কমানোই বার্ধক্যজনিত মানসিক অবক্ষয়ের কিছু ঝুঁকি কমাতে পারে। তবে ঘুমানোর অন্তত চার ঘণ্টা আগে খাওয়া বন্ধ করা এবং প্রতিদিন ৮ থেকে ৯ ঘণ্টার মধ্যে খাবার সীমাবদ্ধ রাখলে অতিরিক্ত উপকার মিলতে পারে।
তার মতে, এই অভ্যাস দৈনন্দিন জীবনে তথ্য মনে রাখা, সমস্যা সমাধান এবং মনোযোগ ধরে রাখার সক্ষমতা উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে।
গবেষকেরা আরও জানান, খাবারের সময়সূচি শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবঘড়ির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এই জৈবঘড়িই ঘুম, শরীরের তাপমাত্রা এবং হরমোন নিঃসরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
আরও গবেষণার প্রয়োজন
গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি তুলনামূলকভাবে ছোট পরিসরের গবেষণা। তাই এই ফলাফল নিশ্চিত করতে বড় আকারের এবং আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
তাদের ভাষ্য, জনসংখ্যার বার্ধক্যের সঙ্গে সঙ্গে আলঝেইমারসহ বিভিন্ন ধরনের ডিমেনশিয়ার প্রকোপ বাড়ছে। বিশেষ করে নারী এবং অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এই ঝুঁকি বেশি। খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার অন্যান্য বিষয় ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও, এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব কি না—তা নিয়ে এখনো খুব কম গবেষণা হয়েছে।
প্রতিদিন ৯ ঘণ্টার মধ্যে খাবার খাওয়া অতিরিক্ত ওজনের নারীদের স্মৃতি ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা উন্নত করতে পারে বলে একটি নতুন গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















