হাঁটা শরীরচর্চার সবচেয়ে সহজ উপায়গুলোর একটি। তবে হাঁটার সঙ্গে যদি বিশেষ ধরনের দুটি লাঠি যুক্ত করা যায়, তাহলে একই সময়ে হাত, কাঁধ, পেট ও পায়ের পেশিরও ব্যায়াম হতে পারে। এমনই একটি ব্যায়ামপদ্ধতি হলো নর্ডিক ওয়াকিং। সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
মূলত শীতকালে বরফের ওপর স্কি করার প্রশিক্ষণ হিসেবে নর্ডিক দেশগুলোতে এই পদ্ধতির ব্যবহার শুরু হয়েছিল। পরে এটি সহজ ও কম চাপের শরীরচর্চা হিসেবে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। নর্ডিক ওয়াকিংয়ে বিশেষভাবে তৈরি দুটি লাঠি ব্যবহার করা হয়, যা মাটিতে হালকা চাপ দিয়ে হাঁটার গতি ও শরীরের নড়াচড়াকে আরও কার্যকর করে।
কেন নর্ডিক ওয়াকিং আলাদা
সাধারণ হাঁটার সময় মূলত পায়ের পেশিই বেশি সক্রিয় থাকে। কিন্তু নর্ডিক ওয়াকিংয়ে দুই হাতে লাঠি ব্যবহার করার কারণে শরীরের ওপরের অংশও কাজে যুক্ত হয়। হাত ও কাঁধের পাশাপাশি পেটের পেশিও সক্রিয় থাকে। ফলে হাঁটাটি অনেকটা পুরো শরীরের ব্যায়ামে পরিণত হয়।
এই পদ্ধতিতে হাঁটু ও শরীরের নিচের দিকের অস্থিসন্ধিতে চাপ তুলনামূলক কম পড়তে পারে। একই সঙ্গে ভারসাম্য ও স্থিরতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। উঁচু পথে হাঁটা সহজ হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘ সময় হাঁটার সময় ক্লান্তিও কিছুটা কম অনুভূত হতে পারে।
বয়স্ক ও নিয়মিত হাঁটেন যারা, তাদের জন্যও উপকারী
যারা অবসরে হাঁটেন, পাহাড়ি বা অসমান পথে হাঁটেন কিংবা বয়সের কারণে চলাফেরায় বাড়তি স্থিরতা চান, তাদের জন্য নর্ডিক ওয়াকিং উপযোগী হতে পারে। হালকা অস্থিসন্ধির অস্বস্তি থাকলেও কারও কারও ক্ষেত্রে এটি স্বস্তিদায়ক হতে পারে।
হাঁটার সময় লাঠি অতিরিক্ত ভরকেন্দ্র হিসেবে কাজ করায় শরীরকে স্থির রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে দীর্ঘ পথে হাঁটার সময় আত্মবিশ্বাস বাড়াতেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
এর আরেকটি সুবিধা হলো, এই ব্যায়ামের জন্য সবসময় ব্যায়ামাগারে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। খোলা জায়গায় হাঁটতে হাঁটতেই শরীরচর্চা করা যায়। ফলে নিয়মিত চলাফেরার সঙ্গে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার সুযোগও তৈরি হয়।
সঠিক নিয়ম জানা জরুরি
নর্ডিক ওয়াকিংয়ের জন্য একটি নয়, দুটি লাঠি একসঙ্গে ব্যবহার করাই গুরুত্বপূর্ণ। এতে দুই পা, দুই হাত, কাঁধ ও পেটের পেশির মধ্যে কাজের ভারসাম্য তৈরি হয়। ফলে হাঁটার গতি আরও স্বাভাবিক ও মসৃণ হতে পারে।
লাঠির উচ্চতাও ঠিক রাখতে হবে। সাধারণত লাঠি ধরে দাঁড়ালে কনুই প্রায় সমকোণে বাঁকানো থাকবে—এমন উচ্চতা উপযুক্ত ধরা হয়।
হাঁটার সময় বাম পা সামনে গেলে ডান হাতের লাঠি সামনে যাবে। একইভাবে ডান পা সামনে গেলে বাম হাতের লাঠি সামনে নিতে হবে। লাঠি শরীরের একেবারে সামনে না রেখে পায়ের পাশে বা সামান্য পেছনে হালকাভাবে বসিয়ে পেছনের দিকে চাপ দিলে হাঁটার গতি বাড়াতে সহায়তা করবে।
কাঁধ শক্ত করে না রেখে স্বাভাবিক ও শিথিল রাখতে হবে। লাঠির হাতলও খুব শক্ত করে আঁকড়ে ধরা উচিত নয়।

যেসব ভুল এড়িয়ে চলতে হবে
দুটি লাঠি একই সময়ে সামনে বসানো, লাঠি শরীরের অনেক দূরে সামনে রাখা, অতিরিক্ত শক্ত করে হাতল ধরা কিংবা নিজের উচ্চতার তুলনায় বেশি লম্বা বা ছোট লাঠি ব্যবহার করা—এসব ভুল হাঁটার স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করতে পারে।
লাঠির ওপর পুরো শরীরের ওজন দিয়ে হাঁটাও ঠিক নয়। এগুলো মূলত চলার সময় সহায়তা ও শরীরের বিভিন্ন অংশকে সক্রিয় করার জন্য ব্যবহার করা হয়।
সবার জন্য উপযুক্ত নয়
নর্ডিক ওয়াকিং সহজ হলেও সবার জন্য এটি সমানভাবে উপযোগী নাও হতে পারে। কাঁধ, কনুই, কবজি বা হাতের নির্দিষ্ট ধরনের আঘাত থাকলে লাঠি ব্যবহারে অস্বস্তি বাড়তে পারে। গুরুতর বাতের সমস্যা, ভারসাম্যের বড় ধরনের অসুবিধা কিংবা হাঁটার ধরনকে প্রভাবিত করে এমন কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলেও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুরু করার আগে চিকিৎসক বা শারীরিক পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সহজ ব্যায়ামেই সুস্থ জীবনের বার্তা
নর্ডিক ওয়াকিংয়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর সরলতা। খুব কঠিন কোনো অনুশীলন ছাড়াই হাঁটার অভ্যাসকে আরও কার্যকর করে তোলা যায়। নিয়মিত চলাফেরা, পেশির শক্তি বাড়ানো এবং সুযোগ পেলেই বাইরে সময় কাটানোর অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ জীবনযাপনে সহায়ক হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট মনে করে, শরীরচর্চা মানেই কঠিন ব্যায়াম নয়। প্রতিদিনের হাঁটাকেও একটু পরিকল্পিতভাবে করলে সেটিই হয়ে উঠতে পারে শরীর ও মনের যত্ন নেওয়ার সহজ পথ।
নর্ডিক ওয়াকিংয়ে বিশেষ লাঠি ব্যবহার করে হাঁটার মাধ্যমে হাত, কাঁধ, পেট ও পায়ের পেশি একসঙ্গে সক্রিয় করা যায়। এটি কম চাপের শরীরচর্চা হিসেবে অনেকের জন্য কার্যকর হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















