ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে টানা পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা শিক্ষাবিষয়ক আন্দোলনের বড় সাফল্য এসেছে। শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কার ও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা তরুণদের নেতৃত্বাধীন ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’র চাপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন। এই ঘটনাকে নিজেদের গণতান্ত্রিক বিজয় হিসেবে দেখছেন আন্দোলনকারীরা।
২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নয়াদিল্লির জন্তর মন্তর এলাকায় শুরু হয় ব্যাপক আনন্দ-উৎসব। যেখানে কয়েক দিন আগেও পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষের দৃশ্য দেখা গিয়েছিল, সেখানেই সেদিন রাতভর গান, নাচ আর উল্লাসে মেতে ওঠেন আন্দোলনের সমর্থকেরা।
পাঁচ সপ্তাহের আন্দোলনে বড় সাফল্য
শিক্ষাক্ষেত্রে নানা সংস্কারের দাবিতে পাঁচ সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে জন্তর মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে আসছিল তরুণদের এই আন্দোলন। তাদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ।
২৫ জুলাই ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করার পর আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের অন্য দাবিগুলো নিয়েও পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।
আন্দোলনকারীদের দাবি অনুযায়ী, মে মাসে অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক চিকিৎসা শিক্ষার ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় মানসিক চাপে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সরকার সম্মত হয়েছে। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা পুলিশের অভিযোগ প্রত্যাহারের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
জন্তর মন্তরে বিজয়ের উচ্ছ্বাস
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর জন্তর মন্তর যেন রাতারাতি প্রতিবাদের জায়গা থেকে উৎসবের মঞ্চে পরিণত হয়। তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সের মানুষ সেখানে জড়ো হন। কেউ নাচেন, কেউ গান করেন, আবার কেউ মিষ্টি ও আইসক্রিম বিতরণ করেন।
অনেককে চলন্ত ট্রাক্টরের ওপরও আনন্দ করতে দেখা যায়। রাত গভীর হওয়ার পরও উৎসুক মানুষ সেখানে আসতে থাকেন।
তবে উৎসবের মধ্যেও পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি নজরে রাখেন আন্দোলনের স্বেচ্ছাসেবকেরা। মানুষের ভিড়ে ছড়িয়ে পড়া আবর্জনা পরিষ্কার করতে স্বেচ্ছায় কাজ করেন কয়েকজন। আন্দোলনের এক কর্মী বলেন, এই আনন্দকে তিনি ভারতের স্বাধীনতার সময়কার নতুন সূচনার অনুভূতির সঙ্গে তুলনা করেছেন।
তরুণদের বিজয় হিসেবে দেখছেন আন্দোলনকারীরা
আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের অনেকেই মনে করছেন, এই পদত্যাগ শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ নয়, বরং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
দিল্লির এক তরুণ আন্দোলনকারী বলেন, এটি গণতন্ত্র ও তরুণ প্রজন্মের জয়। দীর্ঘ সময় পর সরকারকে জনগণের কাছে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।
আন্দোলনকারীদের মধ্যে অনেকের আশা, এই ঘটনার পর দুর্নীতি বা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ক্ষমতাবান ব্যক্তিরাও ভবিষ্যতে আরও সতর্ক হবেন।
পুলিশের দমন আন্দোলনকে আরও শক্ত করেছে
২০ জুলাই আন্দোলনকারীরা তাদের দাবি নিয়ে সংসদ ভবনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। এমনকি গুলির মতো অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগও সামনে আসে।
এর পর আন্দোলনের প্রতি মানুষের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ব্যঙ্গাত্মক ছবি ও প্রচারণার মাধ্যমে আন্দোলনটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়ে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সামনে আরও বড় আন্দোলনের ইঙ্গিত
আন্দোলনের নেতারা স্পষ্ট করেছেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগকে তারা শেষ লক্ষ্য হিসেবে দেখছেন না। তাদের দাবি, সরকারের সামনে দেওয়া পাঁচ দফা সংস্কার বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তরুণেরা বিষয়টি নজরে রাখবেন।
আন্দোলনের মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেছেন, দেশের তরুণেরা এখন সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন। শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন করা হচ্ছে কি না, সেটিও তারা দেখতে চান।
আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে আগেই বলেছিলেন, তাদের লক্ষ্য কেবল একটি রাজনৈতিক দল তৈরি করা নয়। বরং তরুণ, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা বুঝে সরকারের কাছে নিয়মিত জবাবদিহি দাবি করা একটি বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা।
রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর এখন প্রশ্ন উঠেছে, ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ ভবিষ্যতে সরাসরি রাজনীতিতে নামবে কি না।
আন্দোলনের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। তবে আন্দোলনের নেতাদের বক্তব্যে আপাতত সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখার ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দেশটির তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম ও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো বিষয়গুলো নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। ফলে এই আন্দোলন ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত রূপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
‘এটাই শুরু’, বলছেন আন্দোলনের নেতারা
২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর বিশাল জনসমাবেশে আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে বলেন, এটি কেবল প্রথম সাফল্য। এখানেই আন্দোলন থেমে যাবে না।
আন্দোলনকারীদের বক্তব্যে স্পষ্ট, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগকে তারা একটি বড় অর্জন হিসেবে দেখলেও সামনে আরও দীর্ঘ লড়াই রয়েছে। তরুণদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন তাদের পরবর্তী লক্ষ্য।
জন্তর মন্তরের উৎসব শেষ হয়েছে, মঞ্চও খুলে ফেলা হয়েছে। দেয়ালে লেখা প্রতিবাদের অনেক স্লোগান মুছে ফেলা হয়েছে। কিন্তু আন্দোলনের যে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব তৈরি হয়েছে, তা এখন ভারতের তরুণ সমাজের মধ্যে কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়, সেটিই দেখার বিষয়।
ভারতের তরুণদের এই আন্দোলন তাই শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের গল্প নয়; বরং শিক্ষা, জবাবদিহি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে কথা বলার একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে।
ভারতের তরুণদের আন্দোলনে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, পাঁচ সপ্তাহের প্রতিবাদের পর বড় সাফল্য এবং সামনে আরও সংস্কারের দাবি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















