ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা এগোচ্ছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কোনো ফল না এলে ইরানে আবারও সামরিক হামলা শুরু করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
ট্রাম্পের এমন আশাবাদী বক্তব্যের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ইরান জানিয়েছে, তারা নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরুর জন্য কোনো অনুরোধ করেনি। একই সময়ে সৌদি আরব, জর্ডান ও ইরাকে ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে।
আলোচনা চলছে, তবে অবস্থান কঠোর
সারাক্ষণ রিপোর্টের প্রতিবেদনে জানা যায়, শনিবার ইরানে টানা প্রায় দুই সপ্তাহের মার্কিন বিমান হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়। এর পর সোমবার ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ভালো আলোচনা চলছে এবং সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আগের মতো সামরিক অভিযান চালিয়ে যাবে। অর্থাৎ কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি সামরিক চাপও বহাল রাখছে ওয়াশিংটন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে। ইরান কূটনীতির পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি। তবে ইরান নিজে আলোচনার জন্য অনুরোধ করেছে—এমন খবরকে তিনি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন উত্তেজনা
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে রয়েছে বলে তেহরান দাবি করছে।
ইরান জানিয়েছে, তারা নিজেদের উপকূলের কাছাকাছি নির্দিষ্ট একটি পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে দেবে এবং এই চলাচলের ওপর নজরদারির অধিকারও তাদের থাকবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, জলপথটি দিয়ে জাহাজ অবাধে চলাচল করুক।
ইরানের সামরিক কমান্ড অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের জলসীমায় জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারকে হুমকি দিচ্ছে এবং অবৈধ সামুদ্রিক অবরোধ কার্যকর করার চেষ্টা করছে। তেহরানের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ সংঘাত আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, সোমবার ছয়টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অনুমতি ছাড়া যাওয়ার চেষ্টা করায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সৌদি আরবেও ড্রোন হামলার খবর
যুক্তরাষ্ট্রের হামলা সাময়িকভাবে থামার মধ্যেই সৌদি আরব জানিয়েছে, তাদের তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে কয়েকটি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী রিয়াদকেও লক্ষ্য করা হয়েছিল বলে জানানো হয়েছে।
সৌদি আরবের দাবি, ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইরাক থেকে এসব ড্রোন পাঠিয়েছে। দেশটি এ ঘটনার জবাব দেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করেছে।
অন্যদিকে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী জানিয়েছে, তারা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন অবকাঠামোর একটি অংশে হামলা চালিয়েছে। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইরানের ওপর হামলার সহযোগিতার অভিযোগ তুলে এর প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা।
কমছে তেলের দাম
যুক্তরাষ্ট্রের হামলা বন্ধ এবং দুই দেশের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনার খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম এক দিনে ৮ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮২ ডলারে নেমেছে। একই সময়ে উত্তর সাগরের তেলের দামও ৯ শতাংশের বেশি কমে প্রায় ৮৮ ডলারের কাছাকাছি এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা কমলে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্নের ঝুঁকি কমবে—এমন প্রত্যাশাই তেলের দামে এই পতনের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সামরিক অভিযানের সীমা নিয়ে প্রশ্ন

ইরানে হামলা স্থগিতের পেছনে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পরামর্শও ভূমিকা রেখেছে বলে জানা গেছে। মার্কিন এক কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুর সংখ্যা কমে আসছিল এবং বিমান হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের মজুত নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
তবে ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত শেষ হয়ে যাচ্ছে—এমন ধারণা সঠিক নয়। তিনি জানিয়েছেন, ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহের কারণে কমে যাওয়া মজুত দ্রুত পূরণ করা হচ্ছে।
গত দুই সপ্তাহের মার্কিন হামলায় ইরানে বহু মানুষ নিহত হয়েছে এবং দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামোরও ক্ষতি হয়েছে। পাল্টা হামলায় প্রতিবেশী দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিতে চারজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। ইরান উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা চালিয়েছে।
যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনমতেও অস্বস্তি
ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও অসন্তোষ বাড়ছে। সামনের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ সমর্থন দিচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, যুদ্ধের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে ট্রাম্প প্রশাসন যথেষ্ট পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।
এদিকে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার সূচকে সামান্য উন্নতি দেখা গেলেও যুদ্ধ নিয়ে জনসমর্থনের ঘাটতি তার জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।
![]()
সমঝোতার পথ কতটা খোলা
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় নিয়ে জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার একটি কাঠামো তৈরি হয়েছিল। আগস্টের শেষ নাগাদ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হওয়ার কথা ছিল।
তবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অধিকার নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ এখনো রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, আগের সমঝোতায় জলপথ দিয়ে অবাধ চলাচলের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। ইরানের ব্যাখ্যা, সেখানে জাহাজ চলাচল তদারকির অধিকার তাদেরই রয়েছে।
ফলে আলোচনা চললেও সংঘাত পুরোপুরি থেমে গেছে—এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই। হরমুজ প্রণালিতে সামান্য উত্তেজনাও বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের দামের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ট্রাম্পের কূটনৈতিক আশাবাদ শেষ পর্যন্ত বাস্তব সমঝোতায় রূপ নেয় কি না, সেদিকেই এখন নজর মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই টানাপোড়েনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত শুধু দুই দেশের সম্পর্ক নয়, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের গতিপথও নির্ধারণ করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















