ভারতের পরীক্ষা সংস্কার নিয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটিতে আইআইটি মাদ্রাজের পরিচালক ভি কামাকোটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আর তাঁকে ঘিরেই দেশটির রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। লোকসভায় কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর একটি মন্তব্যের পর বিষয়টি রাজনৈতিক উত্তাপ পেয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্যোগে গঠিত এই কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন ইনফোসিসের সহপ্রতিষ্ঠাতা নন্দন নিলেকানি। কমিটিতে ভি কামাকোটি ছাড়াও সাবেক ইসরো চেয়ারম্যান এস সোমনাথ, সাবেক গোয়েন্দা ব্যুরো প্রধান তপন ডেকা, সাবেক শিক্ষা সচিব অনিতা কারওয়াল এবং পরিবহন ও সরবরাহ বিশেষজ্ঞ অমৃত লাল মীনা রয়েছেন।
প্রযুক্তি ও গবেষণায় পরিচিত মুখ কামাকোটি
কামাকোটি ভীঝিনাথন কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে আইআইটি মাদ্রাজ থেকেই স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ২০০১ সালে তিনি একই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা শুরু করেন। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তিনি আইআইটি মাদ্রাজের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন।
কম্পিউটার স্থাপত্য, তথ্যনিরাপত্তা এবং ভিএলএসআই নকশা নিয়ে তাঁর বিশেষজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে আইআইটি মাদ্রাজে দেশীয় মাইক্রোপ্রসেসর তৈরির কর্মসূচিও এগিয়ে যায়। তাঁর গবেষক দল ভারতের প্রথম নিজস্ব মাইক্রোপ্রসেসর ‘শক্তি’ তৈরি করে।

জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন কামাকোটি। বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের গঠিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ দলের চেয়ারম্যানও ছিলেন তিনি।
পদ্মশ্রীসহ একাধিক সম্মান
বিজ্ঞান ও প্রকৌশল ক্ষেত্রে অবদানের জন্য চলতি বছর ভি কামাকোটিকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে। কম্পিউটার স্থাপত্য গবেষণা ও জাতীয় নিরাপত্তায় তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মান দেওয়া হয়।
এ ছাড়া তিনি প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার একাডেমিক উৎকর্ষ পুরস্কার, ভারতীয় ইলেকট্রনিকস ও সেমিকন্ডাক্টর সংস্থার প্রযুক্তি দূরদর্শী পুরস্কার, আজীবন সম্মাননা, আইবিএম শিক্ষক পুরস্কার এবং বাসভিক শিল্প গবেষণা পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি আবদুল কালাম প্রযুক্তি উদ্ভাবন জাতীয় ফেলোশিপেরও অধিকারী।
প্রিয়াঙ্কার মন্তব্যে রাজনৈতিক বিতর্ক
পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে নতুন আইন নিয়ে লোকসভায় বিতর্কের সময় প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বিশেষজ্ঞ কমিটিতে কামাকোটির অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বক্তব্যে তিনি কামাকোটিকে গরুর মূত্র নিয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কটাক্ষ করেন।

তাঁর এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে বিজেপি। দলটির নেতা অনুরাগ ঠাকুর বলেন, দেশের অন্যতম বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও অধ্যাপককে লক্ষ্য করে এমন মন্তব্যে তিনি দুঃখিত। কামাকোটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ দলের সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিতর্কের মধ্যে কামাকোটির রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও লোকসভায় মন্তব্য শোনা যায়। তবে বিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়, কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকা একজন বিজ্ঞানীর যোগ্যতা বা কাজকে খাটো করার কারণ হতে পারে না।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে আস্থাই বড় চ্যালেঞ্জ
পরীক্ষা সংস্কার কমিটিতে দায়িত্ব পাওয়ার পর ভি কামাকোটি বলেছেন, পরীক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রশ্নপত্র প্রস্তুতকারীদের সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা।
তাঁর মতে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত চার দশকে অনেক বেড়েছে। ফলে পরীক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পরীক্ষাকেন্দ্রে নজরদারির জন্য ক্যামেরা ব্যবহারের পাশাপাশি প্রশ্নপত্র প্রস্তুতকারীদের ওপর আস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।
কামাকোটি মনে করেন, প্রশ্নপত্র তৈরি করেন এমন শিক্ষকদের সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে এবং দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অনিয়ম করা যাবে না। তাঁর মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানোর ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
পুরোনো ও নতুন ফাঁসের মধ্যে পার্থক্য
কামাকোটি ২০২৪ সালের জাতীয় যোগ্যতা ও ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় ছাপার পর প্রশ্নপত্র পরিবহনের সময় অনিয়ম হয়েছিল এবং তদন্তে বিষয়টি সীমিত সংখ্যক শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রভাব ফেলেছিল বলে উঠে আসে।
তবে ২০২৬ সালের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ভিন্ন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, এবার প্রশ্নপত্র বিতরণের সময় নয়, বরং প্রশ্নপত্র তৈরির পর্যায় থেকেই সমস্যার সূত্রপাত হয়েছে।
এ কারণেই পরীক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত নজরদারির পাশাপাশি প্রশ্নপত্র প্রস্তুতকারীদের সততা, গোপনীয়তা এবং দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন আইআইটি মাদ্রাজের পরিচালক।
ভি কামাকোটিকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক যতই তীব্র হোক, পরীক্ষা সংস্কার কমিটিতে তাঁর অন্তর্ভুক্তি মূলত প্রযুক্তি, তথ্যনিরাপত্তা এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করতে প্রযুক্তি ও মানবিক সততার সমন্বয় কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।




















