মালয়েশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় জোহর অঙ্গরাজ্যের বহুল আলোচিত ফরেস্ট সিটি এলাকায় আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে ৩৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। অভিযানে বিপুল পরিমাণ কম্পিউটার, মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য ডিজিটাল সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশের মানুষকে লক্ষ্য করে অনলাইনে প্রতারণা চালিয়ে আসছিল।
এই অভিযানের মাধ্যমে শুধু একটি প্রতারণা চক্রের কার্যক্রমই উন্মোচিত হয়নি, বরং সাম্প্রতিক সময়ে নানা বিতর্কে থাকা ফরেস্ট সিটি প্রকল্পও আবারও আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
ক্রিপ্টো বিনিয়োগ ও প্রেমের ফাঁদে প্রতারণা
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, প্রতারকরা দুটি কৌশল ব্যবহার করত। প্রথমটি ছিল ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লাভজনক বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া। দ্বিতীয়টি ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের মাধ্যমে ভুয়া প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে ধীরে ধীরে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা।
তদন্তকারীরা বলছেন, প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং টিকটকের মতো জনপ্রিয় যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ করা হতো। বিশ্বাস অর্জনের পর তাদের বিভিন্ন ভুয়া বিনিয়োগ প্রকল্পে অর্থ পাঠাতে অথবা অন্য অজুহাতে টাকা দিতে উৎসাহিত করা হতো। এই চক্রের প্রধান লক্ষ্য ছিল চীন ও ইন্দোনেশিয়ার নাগরিকরা।
অধিকাংশই বিদেশি নাগরিক
গ্রেপ্তার হওয়া ৩৩৫ জনের মধ্যে ৩০৯ জন চীনের নাগরিক। এছাড়া ১৯ জন ইন্দোনেশিয়ার, চারজন মিয়ানমারের এবং তিনজন মালয়েশিয়ার নাগরিক রয়েছেন। তাদের বয়স ২০ থেকে ৫৮ বছরের মধ্যে।
এত বিপুল সংখ্যক বিদেশি নাগরিকের সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে যে চক্রটি একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক হিসেবে পরিচালিত হচ্ছিল বলে ধারণা করছে তদন্তকারীরা।
বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম জব্দ
পুলিশ জানিয়েছে, গত ১৫ জুলাই পরিচালিত অভিযানে ফরেস্ট সিটির ২৭টি অ্যাপার্টমেন্ট এবং পাঁচটি বাংলোতে একযোগে তল্লাশি চালানো হয়।
অভিযানে ৩১৩টি কম্পিউটার, এক হাজার ৫৫৭টি মোবাইল ফোন এবং প্রায় ১০ লাখ রিঙ্গিত মূল্যের একটি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, এই বিপুল সংখ্যক ডিজিটাল যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতারণার কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
আবারও বিতর্কের কেন্দ্রে ফরেস্ট সিটি
সমুদ্র ভরাট করে নির্মিত ফরেস্ট সিটি প্রকল্পটি শুরু থেকেই নানা কারণে আলোচনায় রয়েছে। বিপুল বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এই নগর প্রকল্পে প্রত্যাশিত হারে ক্রেতা না পাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই এটি নানা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক সেবা খাত এবং আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে আকৃষ্ট করার মাধ্যমে এলাকাটিকে নতুনভাবে সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু একের পর এক বিতর্ক এবং আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত ঘটনায় প্রকল্পটির ভাবমূর্তি বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
সাম্প্রতিক বিতর্ক থেকে আলাদা এই অভিযান
সম্প্রতি একই এলাকায় পরিচালিত একটি শিক্ষা কার্যক্রমকে লাইসেন্সসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে বন্ধের নির্দেশ দেয় মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি পাসপোর্টের অপব্যবহার এবং অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে।
তবে পুলিশ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, অনলাইন প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত সর্বশেষ অভিযানের সঙ্গে ওই শিক্ষা কার্যক্রম বা সংশ্লিষ্ট তদন্তের কোনো সম্পর্ক নেই। দুটি ঘটনাই সম্পূর্ণ আলাদা এবং পৃথক তদন্তের আওতায় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতারণা দমনে নতুন বার্তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনলাইন বিনিয়োগ প্রতারণা এবং ভুয়া প্রেমের সম্পর্কের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ আন্তর্জাতিকভাবে দ্রুত বেড়েছে। এসব অপরাধে সাধারণত বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ব্যবহার করা হয় এবং পরিচালনা করা হয় অত্যাধুনিক ডিজিটাল অবকাঠামোর মাধ্যমে।
মালয়েশিয়ার এই অভিযান আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণা নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে দেশটির কঠোর অবস্থানেরই প্রতিফলন। তদন্ত শেষ হলে এই চক্রের সঙ্গে আরও ব্যক্তি বা সংগঠনের সম্পৃক্ততা সামনে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















