ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত আপাতত কিছুটা স্তিমিত হয়েছে। আকাশে বোমা হামলা বা ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দ না থাকলেও পরিস্থিতিকে কোনো পক্ষই প্রকৃত শান্তি হিসেবে দেখছে না। ইরানের কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তারা আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হননি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসারও কোনো তাড়াহুড়ো তাদের নেই।
ইরানের শাসকগোষ্ঠীর বক্তব্যে আত্মবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট। দেশটির সামরিক নেতারা দাবি করছেন, সংঘর্ষে তারা কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে কূটনীতিকরাও যুক্তরাষ্ট্রের সেই দাবি অস্বীকার করছেন যে ইরান দ্রুত আলোচনায় ফিরতে আগ্রহী।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিকে ইরান এমন এক অবস্থান হিসেবে দেখছে, যেখানে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধও নয়, আবার সম্পূর্ণ শান্তিও নয়। তেহরানের ধারণা, প্রয়োজনে তারা আবারও সংঘর্ষ মোকাবিলা করতে সক্ষম এবং এই অবস্থার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের একটি নির্দিষ্ট মাত্রার চাপ বজায় রয়েছে।
এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। ইরান চায় এই জলপথে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের অবস্থান মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। ফলে বিরোধের অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠেছে এই কৌশলগত জলপথ।

তবে আত্মবিশ্বাসী বক্তব্যের আড়ালে ইরানের জন্য পরিস্থিতি সহজ নয়। দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা দেশটির অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি, বাণিজ্যিক অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। পাশাপাশি যেকোনো সময় আবার সংঘর্ষ শুরু হওয়ার আশঙ্কাও রয়ে গেছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ডের সাবেক মুখপাত্র রমজান শরিফ দাবি করেছেন, প্রতিটি ধাপে তাদের প্রতিপক্ষ কৌশলগতভাবে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে যুদ্ধবিরতি বলা যায় না। তার মতে, এখনো এমন কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতা হয়নি, যা সংঘাতের অবসান নিশ্চিত করে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান আলোচনা করতে আগ্রহী এবং দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ চলছে। তবে ইরান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরানের বক্তব্য, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সরাসরি আলোচনা হচ্ছে না।
ইরানের ভেতরেও এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। একদিকে কট্টরপন্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরুর বিরোধিতা করছে, অন্যদিকে নির্বাচিত সরকারের একটি অংশ কূটনৈতিক পথ খোলা রাখার পক্ষে রয়েছে।
ইরান জানিয়েছে, তাদের বর্তমান আলোচনা মূলত ওমানের সঙ্গে হচ্ছে এবং সেটি হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে। কারণ সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল।
রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিশ্বাস সময় তাদের পক্ষেই কাজ করছে। তারা মনে করছে, অর্থনৈতিক চাপ ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করার ক্ষমতা তাদের রয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকেই এমন একটি সমঝোতায় আসতে হতে পারে, যা ইরানের দাবির সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সংঘর্ষ পুনরায় শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়, যার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের জ্বালানির বাজারে পড়ে। পরে দুই পক্ষের হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ হলে তেলের দাম কিছুটা কমে আসে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি। যুদ্ধ আবার শুরু করলে তা আরও বিস্তৃত আকার নিতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জামের মজুত নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের হাতে ঠিক কতটি ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট রয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা কঠিন। প্রকাশ্য তথ্য সীমিত হওয়ায় দেশটির প্রকৃত সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না। তবে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, ইরানও পূর্ণমাত্রার আরেকটি যুদ্ধ চায় না, বিশেষ করে যদি সেখানে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জড়িত থাকে।
সামগ্রিকভাবে বর্তমান পরিস্থিতি এমন এক অচলাবস্থার জন্ম দিয়েছে, যেখানে দুই পক্ষই নিজেদের শক্তিশালী অবস্থানে দেখাতে চাইছে, কিন্তু কেউই নতুন করে বড় যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নয়। ভবিষ্যতে সমঝোতার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া না গেলেও হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে বিরোধই এখন এই সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল বিষয় হয়ে রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















