ইউরোপে দাবানলের তাণ্ডব যেন প্রতি বছরই আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ফ্রান্স ও স্পেনে আগুন নিয়ন্ত্রণে দমকলকর্মীরা যখন প্রাণপণ লড়াই করছেন এবং হাজার হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন, তখন স্পেনের কিছু অঞ্চলে বন রক্ষায় নেওয়া হয়েছে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। সেখানে আগুন নেভানোর জন্য নয়, বরং আগুন লাগার আগেই তার ঝুঁকি কমাতে ব্যবহার করা হচ্ছে গাধাকে।
ঘাস খেয়েই কমাচ্ছে দাবানলের ঝুঁকি
স্পেনের টিভিসা ডঙ্কি ফায়ারফাইটার্স এবং এল বুরিতো ফেলিজ নামে দুটি উদ্যোগ গাধাকে বন সংরক্ষণের কাজে যুক্ত করেছে। তাদের কাজ খুবই স্বাভাবিক—বনের শুকনো ঘাস, ঝোপঝাড় ও আগাছা খেয়ে ফেলা। কিন্তু এই সাধারণ কাজই দাবানল প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বনের মাটিতে জমে থাকা শুকনো ঘাস ও ঝোপঝাড়ই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। গাধা এসব খেয়ে ফেলায় দাহ্য উপাদানের পরিমাণ কমে যায়। ফলে আগুন লাগলেও তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে না এবং আগুনের তীব্রতাও কমে আসে।
প্রচলিত পদ্ধতির বিকল্প নয়, শক্তিশালী সহায়ক
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাধার মাধ্যমে চারণভূমি পরিষ্কার করা কোনোভাবেই আগুন প্রতিরোধের প্রচলিত ব্যবস্থার বিকল্প নয়। বন পরিষ্কার, অগ্নিনিরোধক ফাঁকা এলাকা তৈরি, আগাম সতর্কতা এবং দ্রুত আগুন শনাক্ত করার মতো ব্যবস্থাগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এসব ব্যবস্থার পাশাপাশি গাধার ব্যবহার কম খরচে দীর্ঘমেয়াদি ও পরিবেশবান্ধব সমাধান হিসেবে ইতোমধ্যে কার্যকারিতা দেখাতে শুরু করেছে।
কেন গাধাকেই বেছে নেওয়া হলো?
টিভিসা ডঙ্কি ফায়ারফাইটার্সের প্রতিষ্ঠাতা জোয়ান সেডো সানস জানান, গাধা অন্য চারণপ্রাণীর তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর।
তার ভাষায়, গাধার ক্ষুধা বেশি এবং তারা কঠিন পরিবেশেও সহজে টিকে থাকতে পারে। ছাগলের তুলনায় গাধার ওজন বেশি হওয়ায় তারা হাঁটার সময় মাটিতে জমে থাকা শুকনো পাতার স্তর ভেঙে দেয়। এতে আগুন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পথ বাধাগ্রস্ত হয়।
এছাড়া গাধার চলাচলে যে সরু পথ তৈরি হয়, জরুরি পরিস্থিতিতে সেই পথ ব্যবহার করে দমকলকর্মীরাও দ্রুত বনাঞ্চলের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন।
![]()
পরিত্যক্ত গাধার নতুন জীবন
করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালে মাত্র তিনটি পরিত্যক্ত গাধা নিয়ে যাত্রা শুরু করে এই উদ্যোগ। বর্তমানে সেখানে ৬২টি গাধা রয়েছে।
এসব গাধার অধিকাংশই আগে অবহেলিত বা নির্যাতিত অবস্থায় ছিল। উদ্ধার করার পর তাদের শারীরিক ও মানসিক পুনর্বাসনে কয়েক মাস থেকে দেড় বছর পর্যন্ত সময় লাগে। এরপরই তারা বন সংরক্ষণের এই বিশেষ দায়িত্বে যুক্ত হয়।
এভাবে একদিকে যেমন প্রাণীগুলোর নতুন জীবন নিশ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে বনও পাচ্ছে প্রাকৃতিক সুরক্ষা।
সবচেয়ে বড় বাধা প্রশাসনিক জটিলতা
যদিও এই উদ্যোগ সফল হয়েছে, নতুন করে এমন প্রকল্প শুরু করা সহজ নয়। জোয়ান সেডো সানসের মতে, প্রশাসনিক জটিলতাই সবচেয়ে বড় বাধা।
প্রতিটি গাধার জন্য পরিচয়পত্র বা ‘পাসপোর্ট’ তৈরি করতে হয়। এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় নিতে গেলেও দীর্ঘ কাগজপত্রের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। বহু বছর ধরে কাজ করায় তাদের জন্য বিষয়টি কিছুটা সহজ হলেও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানেই ভবিষ্যতের সমাধান
ইউরোপে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দাবানলের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু আধুনিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে প্রকৃতির নিজস্ব শক্তিকেও কাজে লাগানোর চেষ্টা বাড়ছে।
স্পেনের এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিচ্ছে, অনেক সময় পরিবেশ রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান লুকিয়ে থাকে প্রকৃতির মধ্যেই। পরিত্যক্ত গাধাকে নতুন জীবন দেওয়ার পাশাপাশি বনকে নিরাপদ রাখার এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যান্য দাবানলপ্রবণ অঞ্চলের জন্যও অনুসরণযোগ্য উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















