০৮:১০ অপরাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬
শুল্ক কমতেই চীনে ফিরছে মার্কিন কোম্পানিগুলোর উৎপাদন পরিকল্পনা ভারতের কলেজে ভর্তির স্বপ্ন এখন ব্যয়বহুল, বাড়ছে পরিবারের আর্থিক চাপ টানা ধাক্কায় অনোয়ারের জোট, নেগেরি সেম্বিলানে ক্ষমতা হারিয়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে মালয়েশিয়া প্রতিবাদের ময়দানে এক সাংবাদিকের যাত্রা: কৌতূহল, সংশয় ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন নগরায়ণের চাপে হারিয়ে যাচ্ছে বেঙ্গালুরুর ঐতিহ্যবাহী ফলের ঝুড়ি, সংকটে দেশি ফল ও সবজির চাষ যক্ষ্মার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বড় বাধা: চিকিৎসা চলছে, কিন্তু সরকারি সহায়তা পৌঁছাচ্ছে না পুলিশের নিরাপত্তা সতর্কতা ছিল রুটিন নির্দেশনা, হামলার নির্দিষ্ট তথ্য নেই: ডিবি প্রধান আমরাই গড়ছি আমাদের প্রাপ্য গণমাধ্যম পাকিস্তানে তুষারধসে প্রাণ গেল বিশ্বখ্যাত পর্বতারোহী নির্মল পুরজা ও ৯ সহযাত্রীর গোপালগঞ্জে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মরণে নির্মিত তোরণে আগুন

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে নতুন কৌশলে ভারত

বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি—চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন কৌশল নিয়েছে ভারত। একদিকে কৌশলগত স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্য—এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটাতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নয়াদিল্লি ধীরে ধীরে দীর্ঘদিনের বেশ কিছু নীতিতে শিথিলতা এনেছে।

অ্যান্টি-ডাম্পিং নীতিতে বড় পরিবর্তন

ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতি নীতি কেন্দ্রের (সি-ডিইপি) তথ্য অনুযায়ী, এই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রভাব পড়েছে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের ক্ষেত্রে।

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, দেশীয় শিল্প ক্ষতির অভিযোগ করলে তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তদন্তে ডাম্পিংয়ের প্রমাণ মিললে অর্থ মন্ত্রণালয়কে শুল্ক আরোপ বা বিদ্যমান শুল্কের মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।

১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এমন ১,০৫২টি সুপারিশের মধ্যে মাত্র পাঁচটি প্রত্যাখ্যান করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। কিন্তু ২০২০ সালের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। কয়েকটি অর্থবছরে প্রত্যাখ্যানের হার ৫০ থেকে ৬২ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পরে কিছুটা কমলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবার তা ৪১.৫ শতাংশে উঠে আসে। প্রত্যাখ্যাত সুপারিশগুলোর বড় অংশই ছিল চীনা পণ্যের বিরুদ্ধে।

সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, চীনের বিরুদ্ধে তদন্ত ও অভিযোগের সংখ্যাই বেশি হওয়ায় প্রত্যাখ্যানের সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে বেশি।

কাঁচামাল আমদানির বাস্তবতা

ভারতের বাণিজ্য নীতিতে আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে আমদানির ধরনে। আগে যেখানে প্রস্তুত পণ্যের দিকে নজর ছিল, এখন গুরুত্ব পাচ্ছে শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও মধ্যবর্তী পণ্য।

ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রীর ভাষ্য, চীন থেকে আমদানি হওয়া অধিকাংশ পণ্যই দেশীয় উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় এবং সেই উৎপাদিত পণ্যের বড় অংশ আবার বিদেশে রপ্তানি করা হয়। ফলে এসব আমদানিতে অতিরিক্ত বাধা শিল্প ও রপ্তানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

দেশীয় শিল্প বনাম উন্মুক্ত বাণিজ্য

এই নীতিগত পরিবর্তন নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরেও মতভেদ রয়েছে।

স্বদেশি অর্থনীতির সমর্থকেরা মনে করেন, অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ককে অনেকেই ভুলভাবে সুরক্ষাবাদ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এটি দেশীয় শিল্পকে অন্যায্য প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষার একটি বৈধ ব্যবস্থা, সুরক্ষাবাদ নয়।

India's balancing act to attract more investment from China, U.S. and boost  trade - The Hindu

চীনা বিনিয়োগে শিথিলতা

বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যেও ভারত কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

২০২০ সালে সীমান্ত-সংলগ্ন দেশগুলোর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হলেও ২০২৬ সালের মার্চে সরকার এমন প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের অনুমতি দেয়, যাদের মালিকানায় সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত চীনা অংশীদারিত্ব রয়েছে।

এরপর জুলাই মাসে চীনা মালিকানা বা সংযোগ থাকা চারটি প্রতিষ্ঠানকে ভারতের বিদ্যুৎ খাতের সরকারি প্রকল্পের দরপত্রে অংশ নেওয়ার অনুমতিও দেওয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যেও ইতিবাচক অগ্রগতি

চীনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কেও সুবিধা আদায়ে সক্রিয় হয়েছে ভারত।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক প্রস্তাবে ভারতের পণ্যের ওপর ১২.৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা থাকলেও পরে ভারত জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর পর চূড়ান্তভাবে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের জন্য শুল্ক ১০ শতাংশে নির্ধারণ করে।

ভারতের দ্বিমুখী কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় ভারত একই সঙ্গে চীনের সরবরাহ শৃঙ্খল, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার এবং নিজস্ব উৎপাদনশীল অর্থনীতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে। এই কৌশল সফল হলে বিদেশি বিনিয়োগ, উৎপাদন ও রপ্তানি—তিন ক্ষেত্রেই ভারত দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হতে পারে। তবে দেশীয় শিল্প সুরক্ষা ও উন্মুক্ত বাণিজ্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

জনপ্রিয় সংবাদ

শুল্ক কমতেই চীনে ফিরছে মার্কিন কোম্পানিগুলোর উৎপাদন পরিকল্পনা

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে নতুন কৌশলে ভারত

০৬:৪৫:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি—চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন কৌশল নিয়েছে ভারত। একদিকে কৌশলগত স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্য—এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটাতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নয়াদিল্লি ধীরে ধীরে দীর্ঘদিনের বেশ কিছু নীতিতে শিথিলতা এনেছে।

অ্যান্টি-ডাম্পিং নীতিতে বড় পরিবর্তন

ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতি নীতি কেন্দ্রের (সি-ডিইপি) তথ্য অনুযায়ী, এই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রভাব পড়েছে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের ক্ষেত্রে।

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, দেশীয় শিল্প ক্ষতির অভিযোগ করলে তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তদন্তে ডাম্পিংয়ের প্রমাণ মিললে অর্থ মন্ত্রণালয়কে শুল্ক আরোপ বা বিদ্যমান শুল্কের মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।

১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এমন ১,০৫২টি সুপারিশের মধ্যে মাত্র পাঁচটি প্রত্যাখ্যান করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। কিন্তু ২০২০ সালের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। কয়েকটি অর্থবছরে প্রত্যাখ্যানের হার ৫০ থেকে ৬২ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পরে কিছুটা কমলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবার তা ৪১.৫ শতাংশে উঠে আসে। প্রত্যাখ্যাত সুপারিশগুলোর বড় অংশই ছিল চীনা পণ্যের বিরুদ্ধে।

সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, চীনের বিরুদ্ধে তদন্ত ও অভিযোগের সংখ্যাই বেশি হওয়ায় প্রত্যাখ্যানের সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে বেশি।

কাঁচামাল আমদানির বাস্তবতা

ভারতের বাণিজ্য নীতিতে আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে আমদানির ধরনে। আগে যেখানে প্রস্তুত পণ্যের দিকে নজর ছিল, এখন গুরুত্ব পাচ্ছে শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও মধ্যবর্তী পণ্য।

ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রীর ভাষ্য, চীন থেকে আমদানি হওয়া অধিকাংশ পণ্যই দেশীয় উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় এবং সেই উৎপাদিত পণ্যের বড় অংশ আবার বিদেশে রপ্তানি করা হয়। ফলে এসব আমদানিতে অতিরিক্ত বাধা শিল্প ও রপ্তানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

দেশীয় শিল্প বনাম উন্মুক্ত বাণিজ্য

এই নীতিগত পরিবর্তন নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরেও মতভেদ রয়েছে।

স্বদেশি অর্থনীতির সমর্থকেরা মনে করেন, অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ককে অনেকেই ভুলভাবে সুরক্ষাবাদ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এটি দেশীয় শিল্পকে অন্যায্য প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষার একটি বৈধ ব্যবস্থা, সুরক্ষাবাদ নয়।

India's balancing act to attract more investment from China, U.S. and boost  trade - The Hindu

চীনা বিনিয়োগে শিথিলতা

বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যেও ভারত কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

২০২০ সালে সীমান্ত-সংলগ্ন দেশগুলোর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হলেও ২০২৬ সালের মার্চে সরকার এমন প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের অনুমতি দেয়, যাদের মালিকানায় সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত চীনা অংশীদারিত্ব রয়েছে।

এরপর জুলাই মাসে চীনা মালিকানা বা সংযোগ থাকা চারটি প্রতিষ্ঠানকে ভারতের বিদ্যুৎ খাতের সরকারি প্রকল্পের দরপত্রে অংশ নেওয়ার অনুমতিও দেওয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যেও ইতিবাচক অগ্রগতি

চীনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কেও সুবিধা আদায়ে সক্রিয় হয়েছে ভারত।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক প্রস্তাবে ভারতের পণ্যের ওপর ১২.৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা থাকলেও পরে ভারত জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর পর চূড়ান্তভাবে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের জন্য শুল্ক ১০ শতাংশে নির্ধারণ করে।

ভারতের দ্বিমুখী কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় ভারত একই সঙ্গে চীনের সরবরাহ শৃঙ্খল, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার এবং নিজস্ব উৎপাদনশীল অর্থনীতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে। এই কৌশল সফল হলে বিদেশি বিনিয়োগ, উৎপাদন ও রপ্তানি—তিন ক্ষেত্রেই ভারত দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হতে পারে। তবে দেশীয় শিল্প সুরক্ষা ও উন্মুক্ত বাণিজ্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।