একজন নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলে শুধু তার নিজের জীবনই বদলে যায় না, বদলে যায় একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং শেষ পর্যন্ত একটি দেশের অর্থনীতিও। নতুন ব্যবসা, কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও নেতৃত্বের মাধ্যমে নারীরা উন্নয়নের চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের পথে এখনো রয়ে গেছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অসংখ্য বাধা।
এসব বাধা দূর করে নারীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ‘ক্লিয়ার হার পাথ’ উদ্যোগের আওতায় দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সফল নারী উদ্যোক্তা, শিক্ষাবিদ, করপোরেট নেতা ও সমাজকর্মীদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছে। তাদের প্রত্যেকের গল্প আলাদা হলেও একটি বিষয় অভিন্ন—সুযোগ, আত্মবিশ্বাস ও সমর্থন পেলে নারীরা শুধু নিজেদের নয়, পুরো সমাজের গতিপথ বদলে দিতে পারেন।
অর্থনীতির মূলধারায় নারীর অংশগ্রহণ
ভারতের উদ্যোক্তা সাইরি চাহাল বিশ্বাস করেন, নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে যখন তারা অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সমানভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।
এই লক্ষ্য থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শিরোজ এবং পরে মহিলা মানি। এই উদ্যোগের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তারা ঋণ, আর্থিক শিক্ষা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার নেটওয়ার্ক পাচ্ছেন। তার ভাষায়, লাখো নারী ইতোমধ্যে আয়, ঋণসুবিধা এবং আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছেন।
তিনি বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো পুঁজির সীমিত প্রবেশাধিকার, অনুসরণযোগ্য নারীর অভাব এবং প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থার বৈষম্য। তার মতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে উঠলেই নারীরা শুধু কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করবেন না, বরং ভবিষ্যতের অর্থনীতির নেতৃত্বও দেবেন।
ভ্রমণ থেকে সামাজিক পরিবর্তনের পথে
বাংলাদেশের সাকিয়া হক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন উপলব্ধি করেন, সমাজ এখনো নারীদের একা ভ্রমণকে সহজভাবে গ্রহণ করে না। সেই বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ভ্রমণকন্যা ট্রাভেলেটস।
সংগঠনটি শুধু ভ্রমণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মোটরসাইকেলে বাংলাদেশের ৬৪ জেলা ভ্রমণ, স্কুলভিত্তিক কর্মশালা, প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা এবং লিঙ্গসমতা নিয়ে কাজের মাধ্যমে এটি একটি বড় সামাজিক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে সংগঠনটির সঙ্গে ৯০ হাজারেরও বেশি নারী যুক্ত রয়েছেন।
সাকিয়া জানান, অনলাইন হয়রানি, সামাজিক বিরূপ প্রতিক্রিয়া এবং নানা ধরনের হুমকি সত্ত্বেও বন্ধু, সহযাত্রী ও নারী কমিউনিটির সমর্থন তাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে।
তার বিশ্বাস, নিজের কাজের প্রতি আস্থা থাকলে এবং লিঙ্গসমতাকে প্রতিষ্ঠা করা গেলে পরিবর্তন অনিবার্য।
নেতৃত্বের টেবিলে আরও নারীর প্রয়োজন
বাংলাদেশের শিক্ষাবিদ ও সুশাসন বিশেষজ্ঞ ড. মেলিটা মেহজাবীন স্মরণ করেন, একসময় একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন, সেখানে নারীদের জন্য আলাদা শৌচাগার পর্যন্ত ছিল না। সেই অভিজ্ঞতা তাকে উপলব্ধি করায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি কতটা সীমিত।
তিনি বলেন, প্রতিদিন প্রস্তুতি, অধ্যবসায় এবং শেখার মানসিকতাই তাকে এগিয়ে নিয়েছে। তার জীবনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন বাবা-মা, যারা শিক্ষা ও অধ্যবসায়ের মূল্য শিখিয়েছেন।
তার মতে, পরিচালনা পর্ষদ, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা শীর্ষ নেতৃত্বে নারীদের দৃশ্যমান উপস্থিতি নতুন প্রজন্মের নারীদের স্বপ্ন দেখতে সাহস জোগায়। নিরাপদ পরিবহন, সহায়ক কর্মপরিবেশ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিমালাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সুযোগ ও মেন্টরশিপের গুরুত্ব
মালদ্বীপের হাজরাথ রশিদ হুসেইন মনে করেন, অধিকাংশ নারী দক্ষতার অভাবে নয়, বরং সুযোগ, পরিচিতি ও পরামর্শের সীমাবদ্ধতার কারণে পিছিয়ে পড়েন।
সুনামি-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রমে কাজ করার পর তিনি টেলিযোগাযোগ খাতে যোগ দেন। প্রযুক্তিগত পটভূমি না থাকলেও সহকর্মীদের সহযোগিতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্কৃতি তাকে নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে।
তার মতে, নিরাপদ শিশুসেবা, সহায়ক কর্মনীতি এবং পরিবারের সমর্থন কর্মজীবী নারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারই সবচেয়ে বড় শক্তি
নেপালের আরতি রানা বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে কর্মক্ষেত্রে নারীদের এখনো নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়।
তিনি মনে করেন, শুধু নীতিমালা নয়; পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সমর্থনই নারীদের এগিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে বড় ভিত্তি। মাতৃত্বকালীন ছুটির সময়সীমা বৃদ্ধি এবং মায়েদের জন্য সহায়ক কর্মপরিবেশ তৈরিকে তিনি ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করেন।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন নেপালের মৌসুমি শ্রেষ্ঠা। তার মতে, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা এবং পরিবারের সমর্থন নারীদের নেতৃত্বে আসার প্রধান শর্ত।
সীমাবদ্ধতাকে শক্তিতে রূপ দেওয়ার গল্প
শ্রীলঙ্কার অ্যাশচারিয়া পিরিস বোমা বিস্ফোরণে দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরও নতুন জীবন শুরু করেন। তিনি কল্পনার নকশাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে একজন সফল ফ্যাশন ডিজাইনার হন এবং এখন নারী, তরুণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অনুপ্রাণিত করছেন।
তার মতে, প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য সহজপ্রাপ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি পরিবারের বিশ্বাস একজন নারীর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার নেভিন্দারি প্রেমারত্নে মনে করেন, নারীদের বড় স্বপ্ন দেখতে শেখানোই পরিবর্তনের সূচনা। আত্মবিশ্বাস, দৃশ্যমান নারী নেতৃত্ব, পরামর্শদাতা, নিরাপদ নেটওয়ার্কিং এবং নমনীয় কর্মপরিবেশ—এসবই নারীদের অগ্রযাত্রার জন্য অপরিহার্য।
একই বার্তা, ভিন্ন অভিজ্ঞতা
ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার এই আট নারীর অভিজ্ঞতা ভিন্ন হলেও তাদের সবার বক্তব্য এক জায়গায় মিলেছে। তারা বিশ্বাস করেন, নারীদের জন্য সমান সুযোগ, আত্মবিশ্বাস, পরিবারের সমর্থন, পরামর্শদাতা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিমালা নিশ্চিত করা গেলে শুধু নারীরাই নয়, পুরো সমাজ ও অর্থনীতিই আরও শক্তিশালী হবে।
তাদের অভিজ্ঞতা দেখায়, একজন নারী যখন সামনে এগিয়ে যান, তখন তিনি একা এগোন না; তার সঙ্গে এগিয়ে যায় আরও অনেক নারী, আর সেই অগ্রযাত্রাই টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে।
Sarakhon Report 



















