পাকিস্তানের ব্রড পিক পর্বতে ভয়াবহ তুষারধসে নিখোঁজ হওয়া বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ-নেপালি পর্বতারোহী নির্মল পুরজা ও তার নয় সহযাত্রীর সবাই নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে তাদের অভিযান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এলিট এক্সপেড।
বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালার ব্রড পিকে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। তুষারধসের পর উদ্ধার অভিযান শুরু হলেও প্রতিকূল আবহাওয়া ও দুর্গম পরিস্থিতির কারণে তা ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। শনিবার অভিযান পরিচালনাকারী সংস্থা জানায়, ওই দলের ১০ সদস্যের কেউই আর বেঁচে নেই।
বিশ্ব পর্বতারোহণে নেমে এসেছে শোকের ছায়া
এলিট এক্সপেড এক বিবৃতিতে জানায়, এই দুর্ঘটনা পুরো বিশ্ব পর্বতারোহণ অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। প্রতিষ্ঠানটি নির্মল পুরজাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা পর্বতারোহী হিসেবে উল্লেখ করে তার পরিবার ও নিহতদের স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, পুরজার নেতৃত্ব, সাহস, বিনয় এবং মানুষের সক্ষমতার প্রতি তার বিশ্বাস বিশ্বের অসংখ্য পর্বতারোহীকে অনুপ্রাণিত করেছে।
উদ্ধার অভিযানে কঠিন চ্যালেঞ্জ
দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকারী দল শুক্রবার পর্যন্ত চারটি মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এর মধ্যে তিনটি মরদেহ প্রচণ্ড প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও নিচে নামিয়ে আনা হয়। হেলিকপ্টার অভিযান বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধার কার্যক্রম কঠিন হয়ে পড়ে।
শনিবার সামরিক বাহিনীর সহায়তায় বিশেষ উদ্ধারকারী দল আবার অভিযান শুরু করে। বাকি মরদেহ উদ্ধারে তৎপরতা চালানো হয়।
পাকিস্তানের আলপাইন ক্লাবের সভাপতি ইরফান আরশাদ খান বলেন, বিভিন্ন দেশের পর্বতারোহীদের মৃত্যু আন্তর্জাতিক পর্বতারোহণ সম্প্রদায়ের জন্য গভীর শোকের ঘটনা। তিনি উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া সামরিক সদস্য, বেসামরিক উদ্ধারকর্মী ও শেরপাদের প্রশংসা করেন।
নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের পর্বতারোহী
স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা তাহির খান জানান, ওমানের পর্বতারোহী নাথিরা আহমেদের মরদেহ ইসলামাবাদে পাঠানো হয়েছে। একই ঘটনায় নিহত মার্কিন পর্বতারোহী ম্যালরি গেইস ও নেপালি পর্বতারোহী বাহাদুর গুরুঙের মরদেহ স্কারদুর একটি হাসপাতালে রাখা হয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, পাকিস্তানে নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী নিহতদের মধ্যে একজন চীনা পর্বতারোহীও ছিলেন।

নির্মল পুরজার অনন্য কীর্তি
নির্মল পুরজা, যিনি নীমস দাই নামেও পরিচিত, নেপালে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কাজ করেন। ২০১৯ সালে তিনি মাত্র ১৮৯ দিনে বিশ্বের ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার ১৪টি পর্বতশৃঙ্গ জয় করে বিশ্ব রেকর্ড গড়েন।
তার এই অসাধারণ অভিযাত্রা নিয়ে তৈরি হয় জনপ্রিয় তথ্যচিত্র ‘১৪ পিকস: নাথিং ইজ ইমপসিবল’। যদিও পরবর্তীতে ২০২৩ সালে তার রেকর্ড ভেঙে দেওয়া হয়, তবুও বিশ্বের অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ী পর্বতারোহী হিসেবে তার অবস্থান অটুট ছিল।
ম্যালরি গেইসের স্বপ্নের অভিযান শেষ হলো
নিহত মার্কিন পর্বতারোহী ম্যালরি গেইসের পরিবার তাকে “উজ্জ্বল আলো” হিসেবে স্মরণ করেছে। পরিবার জানিয়েছে, তিনি স্বজন ও বন্ধুদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন।
পাকিস্তানের ৮ হাজার মিটার উচ্চতার কোনো পর্বত জয় করার এটিই ছিল গেইসের প্রথম প্রচেষ্টা। একই অভিযানে থাকা পাকিস্তানি গাইড সাখির জন্য এটি ছিল সম্ভাব্য শেষ পর্বতারোহণ অভিযান। অভিজ্ঞ পর্বতারোহী হওয়ার পাশাপাশি তিনি ভূগোলবিদ ও উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের আলোকচিত্রী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
দুর্গম পাহাড়ে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে
পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলের পর্বতশ্রেণিতে এমন প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা নতুন নয়। তুষারধস, বরফখণ্ড ধসে পড়া, পাথর পতন, অতিরিক্ত উচ্চতা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল আবহাওয়া পর্বতারোহীদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।
ব্রড পিকসহ কারাকোরাম অঞ্চলের পর্বতগুলো বিশ্বজুড়ে অভিযাত্রীদের আকর্ষণ করলেও সাম্প্রতিক এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গগুলোর পথে প্রতিটি পদক্ষেপেই লুকিয়ে থাকে ভয়াবহ বিপদ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















