ভারতের উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের পথ দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে দেশটির নামকরা সরকারি কলেজ ও পেশাভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি আসন পাওয়ার প্রতিযোগিতা এতটাই তীব্র হয়েছে যে, শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি পরিবারগুলোকেও বহন করতে হচ্ছে বিশাল আর্থিক চাপ।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ সেই সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। মেডিকেল কলেজে ভর্তির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন শুধু পরীক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাই নয়, বরং দেশটির ক্রমবর্ধমান কোচিং বা বেসরকারি শিক্ষাদান ব্যবস্থার ব্যয়বহুল বাস্তবতাও প্রকাশ করেছে।
জুলাই মাসে দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন বড় শহরে হাজারো শিক্ষার্থী রাস্তায় নামে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সরকারকে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা আবার নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। পরিস্থিতির চাপে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেন।
বিরোধীরাও এই ইস্যুতে সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগ দাবি করেন।
শিক্ষার খরচ বাড়ছে আয়ের চেয়ে দ্রুত
ভারতের পরিবারগুলোর আয় বাড়লেও শিক্ষার ব্যয় বেড়েছে তার চেয়ে অনেক দ্রুত। গত এক দশকে পরিবারের আয় বছরে গড়ে প্রায় ১১ দশমিক ৯ শতাংশ হারে বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে শিক্ষা খাতে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ হারে।
দেশটির একটি বেসরকারি অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে একটি গড় ভারতীয় পরিবার তাদের মোট আয়ের প্রায় ৩ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করছে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এর মধ্যে বেসরকারি কোচিং বা অতিরিক্ত শিক্ষার খরচ সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ হারে বেড়েছে এই খাতের ব্যয়। স্কুল ও কলেজের ফি বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ হারে। বই কেনার খরচও বেড়েছে প্রায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
অনেক পরিবারের কাছে এই বাড়তি খরচের মূল লক্ষ্য হলো একটি ভালো সরকারি কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ তৈরি করা। কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা শিক্ষার খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। পাঁচ বছরের একটি মেডিকেল ডিগ্রি সরকারি কলেজে শেষ করতে খরচ হতে পারে প্রায় ৫০ হাজার রুপি। অথচ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একই শিক্ষার জন্য খরচ কয়েক লাখ থেকে ৫০ লাখ রুপিরও বেশি হতে পারে।
শীর্ষ কলেজে আসনের জন্য তীব্র লড়াই
ভারতে চিকিৎসা ও প্রকৌশল শিক্ষা দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে। কারণ ভালো চাকরির সুযোগ সীমিত হওয়ায় এসব পেশাকে নিরাপদ ভবিষ্যতের পথ হিসেবে দেখেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।
২০২৬ সালের বাতিল হওয়া জাতীয় চিকিৎসা ভর্তি পরীক্ষায় প্রায় ২৩ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। কিন্তু সারা দেশে স্নাতক পর্যায়ের মেডিকেল আসন ছিল প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার। এর মধ্যে দেশের শীর্ষ ৫০টি মেডিকেল কলেজে আসন ছিল ১০ হাজারেরও কম।
প্রকৌশল শিক্ষাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। দেশটির শীর্ষ প্রযুক্তিবিদদের অনেকেই যেসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন, সেসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার প্রতিযোগিতা অত্যন্ত কঠিন। প্রকৌশল ভর্তি পরীক্ষায় ২০২৬ সালে প্রায় ১৬ লাখ শিক্ষার্থী নিবন্ধন করলেও দেশের শীর্ষ ১০০টি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানে প্রথম বর্ষের আসন রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার।
কোচিং ব্যবসার দ্রুত বিস্তার
শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি নিশ্চিত করতে অভিভাবকেরা ক্রমেই বেশি অর্থ ব্যয় করছেন বেসরকারি কোচিং প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু এই খাতের বড় অংশ এখনো যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
২০২৪ সালে ভারত সরকার কোচিং প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কিছু নির্দেশনা চালু করে। অতিরিক্ত ফি নেওয়া, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা এবং নানা অনিয়মের অভিযোগের পর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে শিক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশ রাজ্য সরকারের অধীনে থাকায় কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ সীমিত।
সরকারি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী বেসরকারি কোচিংয়ে যুক্ত ছিল। ২০১৮ সালে এই হার ছিল ৩০ শতাংশ।
পরিবারের শিক্ষা বাজেটে বাড়ছে কোচিংয়ের অংশ
২০২৫ সালে একটি পরিবারের সন্তানের শিক্ষা ব্যয়ের প্রায় ১৬ শতাংশ চলে গেছে বেসরকারি কোচিংয়ের পেছনে। ২০১৮ সালে এই হার ছিল ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।
উচ্চ শ্রেণিতে উঠলে কোচিংয়ের খরচ আরও বেড়ে যায়। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পরিবারগুলো ২০২৫ সালে শিক্ষা বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কোচিংয়ের জন্য ব্যয় করেছে। ২০১৮ সালে এই হার ছিল ১৮ শতাংশ।
গ্রামীণ এলাকায় এই চাপ আরও বেশি। অনেক পরিবার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার আশায় নিজেদের আয়ের বড় অংশ অতিরিক্ত শিক্ষার পেছনে ব্যয় করছে।
সরকারি শিক্ষাব্যয়ে কমছে অংশীদারত্ব
ভারতে কোচিং নির্ভরতা বাড়ার সময়েই সরকারি বাজেটে শিক্ষা খাতের অংশ ধীরে ধীরে কমেছে।
যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ টাকার অঙ্কে বেড়েছে, তবে মোট সরকারি ব্যয়ের তুলনায় এর অংশ কমেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রায় ১ দশমিক ৩৯ ট্রিলিয়ন রুপি বরাদ্দ পেয়েছে, যা মোট সরকারি ব্যয়ের প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল চ্যালেঞ্জ শুধু পরীক্ষার স্বচ্ছতা নয়, বরং মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়া এবং সেই সুযোগ পেতে পরিবারের ওপর বাড়তে থাকা আর্থিক চাপ।
ক্রমবর্ধমান কোচিং নির্ভরতা দেখাচ্ছে, দেশের লাখো তরুণের জন্য উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন এখন শুধু মেধার লড়াই নয়, একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতারও পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















