অস্ট্রেলিয়া থেকে ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় পৌঁছাতে দীর্ঘ যাত্রা সবসময়ই ভ্রমণকারীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সেই বাস্তবতাকে বদলে দিতে বিশ্বের দীর্ঘতম বাণিজ্যিক বিরতিহীন বিমানসেবা চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বিমানসংস্থা ক্যান্টাস। ‘প্রজেক্ট সানরাইজ’ নামে এই উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ শুধু নতুন রুট চালুর পরিকল্পনা নয়, বরং দীর্ঘ দূরত্বের বিমান ভ্রমণকে আরও আরামদায়ক, নিরাপদ ও মানবকেন্দ্রিক করে তোলার একটি বৈপ্লবিক প্রচেষ্টা।
এক দশকের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে
প্রায় এক দশক ধরে পরিকল্পিত এই প্রকল্পের ঘোষণা আসে ২০১৭ সালে। লক্ষ্য ছিল অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূল থেকে সরাসরি লন্ডন ও নিউইয়র্কে উড়ে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করা। এর ফলে যাত্রার সময় চার ঘণ্টা পর্যন্ত কমে আসবে এবং যাত্রীদের আর মাঝপথে বিমান পরিবর্তন বা দীর্ঘ বিরতির ঝামেলায় পড়তে হবে না।
এই লক্ষ্য পূরণে বিশেষভাবে তৈরি করা হচ্ছে নতুন প্রজন্মের দূরপাল্লার বিমান। বর্তমানে উৎপাদনাধীন বিশেষ সংস্করণের এই উড়োজাহাজে এমন প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে, যা একটানা প্রায় ২২ ঘণ্টা আকাশে থাকার সক্ষমতা দেবে।
শুধু বিমান নয়, বদলাচ্ছে পুরো ভ্রমণের ধারণা

এই প্রকল্পে কেবল নতুন বিমান তৈরি করাই নয়, বরং ভ্রমণের প্রতিটি ধাপকে নতুনভাবে ভাবা হয়েছে। ক্যান্টাসের প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, চিকিৎসা গবেষক, রুট পরিকল্পনাবিদ এবং পাইলটরা একসঙ্গে কাজ করছেন।
ঘুম বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘ সময় উড়ানের সময় পাইলটদের ক্লান্তি নিয়ে গবেষণা করছেন। অন্যদিকে চিকিৎসা গবেষকেরা পরীক্ষা করছেন দীর্ঘ যাত্রা মানুষের শরীর ও মানসিক অবস্থার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই তৈরি হচ্ছে নতুন পরিচালনাব্যবস্থা ও যাত্রীসেবা।
অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণে পাইলটরা
সিডনির কাছে একটি উন্নতমানের ফ্লাইট সিমুলেটরে পাইলটদের দীর্ঘতম উড়ানের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বাস্তবের সঙ্গে এতটাই মিল রয়েছে যে অনেক সময় প্রকৃত বিমান চালানোর অনুভূতি তৈরি হয়।
ক্যান্টাসের পাইলট ও প্রশিক্ষক বারবারা ফিনাটজারের ভাষায়, এমন উড়ানের প্রস্তুতি শুধু যাত্রার আগের দিন শুরু হয় না; একজন পাইলটের পুরো কর্মজীবনের দক্ষতা, নিয়মিত অনুশীলন ও অভিজ্ঞতাই তাকে এই দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত করে তোলে।
প্রতিটি দীর্ঘ যাত্রার আগে পাইলটদের পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
যাত্রীস্বাচ্ছন্দ্যই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার
প্রজেক্ট সানরাইজের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো যাত্রীদের আরামকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।

এ কারণে একই ধরনের বিমানে যেখানে সাধারণত ৩০০ জনের বেশি যাত্রী বহন করা হয়, সেখানে এই বিমানে রাখা হবে মাত্র ২৩৮টি আসন। ফলে ভেতরের পরিবেশ হবে অনেক বেশি প্রশস্ত এবং স্বাচ্ছন্দ্যময়।
ক্যান্টাসের কর্মকর্তাদের মতে, বিমানের ভেতরটি প্রচলিত যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের পরিবর্তে একাধিক আরামদায়ক বাসযোগ্য স্থানের মতো অনুভূতি দেবে।
জেট ল্যাগ কমাতে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা
দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি কমাতে বিমানে যুক্ত করা হয়েছে নানা নতুন ব্যবস্থা।
আসনগুলো আগের তুলনায় আরও প্রশস্ত করা হয়েছে। ব্যবহার করা হচ্ছে মেমোরি ফোমের কুশন, উন্নত পায়ের বিশ্রামব্যবস্থা এবং নতুন ধরনের খাবারের পরিকল্পনা।
এছাড়া যাত্রীদের শরীরের স্বাভাবিক জৈবঘড়ির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পুরো যাত্রায় ১২ ধরনের আলোর পরিবেশ ব্যবহার করা হবে। খাবার পরিবেশনের সময়ও নির্ধারণ করা হয়েছে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে।
আকাশেই থাকবে শরীরচর্চার সুযোগ
এই প্রকল্পের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী সংযোজন হলো ‘ওয়েলবিয়িং জোন’।

এটি এমন একটি বিশেষ স্থান, যেখানে যাত্রীরা উঠে দাঁড়িয়ে শরীর প্রসারিত করতে পারবেন, হালকা ব্যায়াম করতে পারবেন এবং পর্যাপ্ত পানি পান করে নিজেকে সতেজ রাখতে পারবেন।
ক্যান্টাসের কর্মকর্তারা এই স্থানটিকে আকাশের একটি ছোট যোগব্যায়াম কক্ষের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
গবেষণাই সাফল্যের ভিত্তি
দীর্ঘ দূরত্বের উড়ানকে নিরাপদ ও আরামদায়ক করতে ক্যান্টাস বহু বছর ধরে চিকিৎসা গবেষকদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে।
পরীক্ষামূলক উড়ানে পাইলট ও যাত্রীদের শরীরের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করেই ক্লান্তি নিয়ন্ত্রণ, আলো, খাবার ও বিশ্রামসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতের বিমান ভ্রমণের নতুন সংজ্ঞা

প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের মতে, এটি শুধু একটি বিমানসেবা চালুর উদ্যোগ নয়; বরং বিশ্ব বিমান চলাচলের নতুন যুগের সূচনা।
তাদের বিশ্বাস, একসময় ইউরোপে একবার যাত্রাবিরতি দিয়ে পৌঁছানো যেমন বড় সাফল্য ছিল, তেমনি আজ বিরতিহীন ২২ ঘণ্টার উড়ান সেই সীমাকেই আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
প্রজেক্ট সানরাইজ সফল হলে অস্ট্রেলিয়া থেকে বিশ্বের প্রায় যেকোনো গন্তব্যে একটানা উড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা আন্তর্জাতিক বিমান ভ্রমণের ধারণাকেই বদলে দিতে পারে।
আকাশপথে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের এই উদ্যোগ শুধু প্রযুক্তিগত অর্জন নয়; এটি মানুষের ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে আরও আরামদায়ক, দ্রুত এবং বৈজ্ঞানিকভাবে উন্নত করার এক সাহসী পদক্ষেপ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















