দক্ষিণ কোরিয়ায় কাঙ্ক্ষিত চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ায় ক্রমেই বেশি সংখ্যক তরুণ কর্মসংস্থানের জন্য জাপানের দিকে ঝুঁকছেন। একদিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় নতুন স্নাতকদের জন্য ভালো চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে জনসংখ্যা সংকটে ভুগতে থাকা জাপান দক্ষ তরুণ কর্মী খুঁজছে। ফলে দুই দেশের শ্রমবাজারে নতুন ধরনের সংযোগ তৈরি হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সরকারি সহায়তায় বিদেশে চাকরি পাওয়া দক্ষিণ কোরিয়ান তরুণদের মধ্যে সবচেয়ে বড় গন্তব্য ছিল জাপান। এই সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৪৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে চাকরি পাওয়া কোরিয়ানদের সংখ্যা ২৯ শতাংশ কমেছে।
চাকরির বাজারে দুই দেশের ভিন্ন বাস্তবতা
দক্ষিণ কোরিয়ার বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত অভিজ্ঞ কর্মীদের অগ্রাধিকার দেয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী চাকরি পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হন।
অন্যদিকে জাপানের বহু প্রতিষ্ঠান এখনো নতুন স্নাতকদের নিয়োগ দিয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ কর্মীতে পরিণত করার নীতি অনুসরণ করে। দেশটির দ্রুত বার্ধক্যজনিত জনসংখ্যা ও শ্রমিক সংকটের কারণে বিদেশি কর্মীদের প্রতি আগ্রহও বাড়ছে।
জুন মাসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ায় তরুণদের বেকারত্বের হার ছিল ৭ শতাংশ। একই সময়ে জাপানের সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ।
সিউলে বাড়ছে জাপানভিত্তিক চাকরি মেলা
চলতি বছরে সিউলে অন্তত তিনটি জাপান-কেন্দ্রিক চাকরি মেলার আয়োজন হয়েছে। সেখানে জাপানের বিভিন্ন প্রযুক্তি, শিল্প ও প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নিয়োগের জন্য অংশ নেয়।
একই সঙ্গে প্রযুক্তিখাতে দক্ষ জনবল নিয়োগে কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও দক্ষিণ কোরিয়ার চাকরিপ্রার্থীদের জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ বাড়িয়েছে।
কেন জাপান বেছে নিচ্ছেন তরুণরা?
অনেক দক্ষিণ কোরিয়ান শিক্ষার্থী আগে থেকেই জাপানে বসবাস ও কাজ করার আগ্রহ পোষণ করেন। তাদের কাছে জাপানি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিম সি-হিয়ন জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান অভিজ্ঞ কর্মী খোঁজে, কিন্তু জাপানের অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন স্নাতকদেরও নিয়োগ দেয়। তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে কাজ করার সুযোগও তাকে জাপানের প্রতি আকৃষ্ট করেছে।
কোরিয়ান কর্মীদের মূল্য দিচ্ছে জাপানি প্রতিষ্ঠান

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাষাগত দক্ষতা, শিক্ষা এবং কর্মনিষ্ঠার কারণে দক্ষিণ কোরিয়ান চাকরিপ্রার্থীরা জাপানি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য।
অনেক কোরিয়ান তরুণ জাপানি ভাষায় দক্ষ হওয়ায় কর্মক্ষেত্রে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেন। পাশাপাশি দুই দেশের সাংস্কৃতিক কিছু মিলও তাদের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করছে।
বর্তমানে জাপানে কর্মরত ৮০ হাজারের বেশি দক্ষিণ কোরিয়ানের বেশিরভাগই খুচরা বিক্রয়, তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার ও গেম উন্নয়নের মতো পেশাদার খাতে কাজ করছেন।
সম্পর্কের নতুন সেতুবন্ধন
কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগও বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপানে দক্ষিণ কোরিয়ান পর্যটকের সংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে দুই দেশের নাগরিকদের মধ্যে বিয়ের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
চাকরির মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করলে দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সাংস্কৃতিক বিনিময় আরও গভীর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদেশি কর্মী ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ
তবে জাপানি প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অনেক দক্ষিণ কোরিয়ান কর্মী ভালো বেতন ও ক্যারিয়ারের সুযোগ পেলে দ্রুত চাকরি পরিবর্তন করেন। অথচ জাপানের অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ প্রশিক্ষণ, সীমিত পদোন্নতির সুযোগ এবং নির্দিষ্ট কাজের বাইরে দক্ষতা ব্যবহারের সুযোগ কম থাকলে বিদেশি কর্মীদের ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণদের জন্য জাপান এখন শুধু একটি কর্মসংস্থানের বাজার নয়, বরং নতুন অভিজ্ঞতা, পেশাগত উন্নয়ন এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















