গ্রিসে ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে কাজ করার সময় আকাশে দুটি অগ্নিনির্বাপক হেলিকপ্টারের সংঘর্ষে দুইজন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে দেশটির রাজধানী এথেন্সের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে দাবানলে শতাধিক বাড়ি পুড়ে গেছে এবং পর্যটন দ্বীপ কেফালোনিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় হাজারো মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
রোববার গ্রিসের অগ্নিনির্বাপণ বিভাগ জানায়, অ্যাটিকা অঞ্চলের সাথা এলাকায় আগুন নেভানোর অভিযানের সময় দুটি হেলিকপ্টারের সংঘর্ষ হয়। একটি হেলিকপ্টারে থাকা একজন গ্রিক ও একজন ডেনিশ নাগরিক নিহত হন। অন্য হেলিকপ্টারে থাকা একজন গ্রিক ও একজন ব্রিটিশ নাগরিক প্রাণে বেঁচে যান। দুর্ঘটনার কারণ জানতে তদন্ত শুরু হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, নিচ দিয়ে উড়ে যাওয়া একটি হেলিকপ্টারের মূল রোটর ওপরের হেলিকপ্টারের নিচের অংশে আঘাত করে। এরপর নিচের হেলিকপ্টারটি আগুন ধরে মাটিতে বিধ্বস্ত হয়। তবে ভিডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
বিদ্যুতের স্ফুলিঙ্গ থেকে আগুনের সূত্রপাতের সন্দেহ

প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, বোয়োশিয়া অঞ্চলে শুরু হওয়া আগুন একটি বেসরকারি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের তার থেকে উৎপন্ন স্ফুলিঙ্গের কারণে লাগে। ওই লাইন দিয়ে বায়ুচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছিল।
এ ঘটনায় অবহেলার অভিযোগে দুইজন গ্রিক নাগরিককে আটক করা হয়েছে। আরও একজন সন্দেহভাজনকে খুঁজছে কর্তৃপক্ষ।
শতাধিক বাড়ি পুড়েছে, সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বাসিন্দাদের
প্রবল বাতাসে এথেন্স থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে পোর্তো জেরমেনো এলাকার আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরে আগুন পাহাড় অতিক্রম করে ভেনিজা এলাকায় পৌঁছে একটি সামরিক প্রশিক্ষণক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে অবিস্ফোরিত গোলাবারুদে আগুন ধরে যায়।
জরুরি সেবাকর্মীরা প্রায় ৩০ হাজার মানুষের উপকূলীয় শহর মেগারার দিকে আগুনের বিস্তার ঠেকাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পশ্চিম অ্যাটিকার বিভিন্ন বসতি ও শিল্পাঞ্চলের জন্য জরুরি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ জারি করা হয়েছে।
আগিওস কনস্তানতিনোস গ্রামের বাসিন্দা তাসোস তজেমবেলিকোস বলেন, আগুন রাত থেকেই জ্বলছে। সব জায়গায় উদ্ধারকর্মী পৌঁছানো সম্ভব নয়। তাই স্থানীয়রাই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী আগুন নেভানোর চেষ্টা করছেন।
এদিকে কেফালোনিয়া দ্বীপের দক্ষিণাঞ্চলের পাস্ত্রা এলাকায় আগুন লাগার পর রাতের মধ্যেই একাধিক বসতির মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রীর সতর্কবার্তা
গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোতাকিস বলেছেন, এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন প্রকৃতির শক্তি এবং আবহাওয়ার তীব্রতা মানুষের সব ধরনের পরিকল্পনা ও সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়। তিনি আগুন মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
ফ্রান্সে বাতাসের দিক বদলে নতুন সংকট
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও দাবানলের পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। বাতাসের দিক পরিবর্তনের কারণে আগুন ঘন বনাঞ্চলের দিকে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে পৌঁছানো দমকলকর্মীদের জন্য অত্যন্ত কঠিন।
ঐতিহাসিক শহর কারকাসনের কাছে মহাসড়কের পাশে আরেকটি আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, একটি জ্বলন্ত যানবাহন থেকে আগুনের সৃষ্টি হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে মহাসড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং পাশের একটি প্রাণী উদ্যান খালি করা হয়েছে।
স্পেনে কিছুটা স্বস্তি
স্পেনের মধ্যাঞ্চলে গত সপ্তাহে কয়েক হাজার হেক্টর বনভূমি পুড়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে কয়েকটি এলাকায় আবারও আগুন জ্বলে ওঠায় দমকলকর্মীরা সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন।
![]()
পশ্চিমাঞ্চলীয় কাসেরেস প্রদেশে নতুন দাবানলের কারণে প্রায় ৮০০ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে তারা বাড়ি ফিরলেও আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় ঘরের ভেতরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
খরায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হাঙ্গেরিতে
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এখন শুধু দাবানল নয়, তীব্র খরারও মুখোমুখি। ড্যানিউব নদীর পানির স্তর ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ায় হাঙ্গেরির একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চার দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো বন্ধ করতে হয়েছে।
দেশটির প্রধানমন্ত্রী পিটার মাজার জানান, সামনের কয়েক দিন পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ হতে পারে। বৃষ্টির অভাবে নদীর পানি কমে যাওয়ায় নৌপরিবহন, পর্যটন এবং পানি ব্যবহারের ওপরও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।
সার্বিয়াতেও ড্যানিউব নদীর পানি ১৯৮৫ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এতে দেশটির বৃহত্তম জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন দৈনিক সক্ষমতার মাত্র এক-পঞ্চমাংশে নেমে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, বৃষ্টিপাতের ঘাটতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইউরোপজুড়ে দাবানল ও খরার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। ফলে চলতি গ্রীষ্মে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















