০৭:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬
যুদ্ধের চেয়ে বড় সংকট: নিয়ন্ত্রণহীন সংঘাতের মুখে বিশ্ব অন্ধকারের মধ্যেও আলোর খোঁজ: জ্বালানি সংকটে কিউবার মানুষের লড়াই থামছে না হলিউডে ‘দ্য ওডিসি’ ঘিরে নতুন বিতর্ক: অনুবাদকের কঠোর সমালোচনায় মুখোমুখি সাহিত্য ও সিনেমার দুই দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে কবিতার উচ্চারণ: লিন্টন কওয়েসি জনসনের কণ্ঠ কেন আজও সমান প্রাসঙ্গিক ভয়কে হারানোর পথ কখনও কখনও পাহাড়ের কিনারায়—উচ্চতাভীতির সঙ্গে এক মানুষের সাহসী লড়াই শ্রেণিকক্ষ থেকে টেনে বের করে শিক্ষিকাকে নৃশংস হত্যাকাণ্ড, আতঙ্কে ফরিদাবাদের বিদ্যালয় বিজেপির দুর্গে প্রশান্ত কিশোরের অগ্রগতি, ‘এটাই শেষের শুরু’—তীব্র কটাক্ষ বিরোধীদের বিজেপির শক্ত ঘাঁটিতে প্রশান্ত কিশোরের অগ্রগতি, ‘এটাই শেষের শুরু’—বিরোধীদের তীব্র কটাক্ষ সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট বার্তা: গুরুতর অপরাধ না থাকলে ছাত্র আন্দোলনের মামলায় এফআইআর প্রত্যাহার করা যাবে ইন্দোনেশিয়ার ‘লিটল টেক্সাসে’ এখনো চলে পুরোনো পদ্ধতিতে তেল উত্তোলন

বন ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতায় ভয়াবহ দাবানল, ফ্রান্সে কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় অগ্নিকাণ্ডে প্রশ্নের মুখে প্রশাসন

দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় দাবানলের পর দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বন ব্যবস্থাপনা ও অগ্নি প্রতিরোধ নিয়ে তীব্র বিতর্ক। বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং বন মালিকদের অভিযোগ, ২০২২ সালের ভয়াবহ দাবানলের পর সরকার যেসব প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছিল, সেগুলোর বড় অংশই বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে এবারের আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে শত শত বাড়ি ধ্বংস করেছে এবং শান্তিকালে ফ্রান্সের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জনসাধারণের সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

এই অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২৪০টি বাড়ি পুড়ে গেছে এবং ৪২ হাজার হেক্টরেরও বেশি বনভূমি আগুনে ধ্বংস হয়েছে। বিপুল সংখ্যক মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে।

চার বছর আগের সতর্কবার্তা বাস্তবায়িত হয়নি

২০২২ সালে বোর্দোর আশপাশে বড় দাবানলের পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোরভাবে বন পরিষ্কার ও অগ্নি প্রতিরোধ বিধিমালা কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

নিয়ম অনুযায়ী, বাড়ির চারপাশে অন্তত ৫০ মিটার পর্যন্ত ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখা, নিচু ডালপালা ছাঁটাই করা এবং আগুন ছড়ানোর মতো শুকনো উদ্ভিদ অপসারণ করার কথা ছিল। নির্দেশনা না মানলে জরিমানার ব্যবস্থাও রাখা হয়।

কিন্তু চার বছর পর দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ এলাকায় সেই নির্দেশনা কার্যকর হয়নি। বহু এলাকায় বাড়ির একেবারে গা ঘেঁষে ঝোপঝাড় ও গাছপালা রয়ে গেছে, যা আগুন দ্রুত বসতিতে পৌঁছে দিতে সাহায্য করেছে।

কেন মানা হয়নি নিয়ম?

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক বাসিন্দা নিজেদের বাড়ির আশপাশের জমির মালিক নন। ফলে আইন অনুযায়ী পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব থাকলেও বাস্তবে তারা সেই কাজ করতে পারেননি।

অন্যদিকে অনেকের পক্ষে প্রতিবছর কয়েক হাজার ইউরো ব্যয় করে ঝোপঝাড় পরিষ্কার করাও সম্ভব নয়। ফলে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের অনেকেই স্বীকার করেছেন, নিয়ম বাস্তবায়নে তাদেরও ঘাটতি ছিল।

France's largest wildfire in decades 'under control', says minister

আগুন কীভাবে এত দ্রুত ছড়াল?

তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, একটি বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারদের ব্যবহৃত ঝোপ পরিষ্কার করার যন্ত্র থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়।

তবে আগুন এত দ্রুত বিস্তৃত হওয়ার পেছনে আরও কয়েকটি কারণ কাজ করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

বছরের পর বছর ধরে একই ধরনের পাইন গাছ দিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা ভরে ওঠায় বনটি কার্যত একটানা দাহ্য অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। মাঝখানে পর্যাপ্ত ফাঁকা এলাকা বা অগ্নিনিরোধক করিডর তৈরি না হওয়ায় আগুন বাধাহীনভাবে এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক জায়গায় এমন অবস্থা ছিল যেন পাশাপাশি সাজানো অসংখ্য দেশলাই কাঠিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও স্পষ্ট

বিজ্ঞানীরা বলছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়িয়েছে। এর ফলে তাপমাত্রা বেড়ে বনভূমি আরও শুষ্ক হয়ে পড়ছে এবং সামান্য স্ফুলিঙ্গ থেকেও বড় দাবানল তৈরি হচ্ছে।

এই অগ্নিকাণ্ডে প্রথমবারের মতো ফ্রান্সে আগুনের তীব্রতার কারণে বিশেষ ধরনের অগ্নিমেঘ সৃষ্টি হয়েছে, যা আগুন নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তোলে।

দমকল বাহিনীর ক্ষোভ

দমকল সদস্যরা জানিয়েছেন, অনেক বাড়ি রক্ষার সময় তারা দেখেছেন বাড়ির চারপাশে আগুন ধরার মতো শুকনো ঝোপঝাড় অক্ষত অবস্থায় ছিল।

তাদের মতে, আইন অনুযায়ী পরিষ্কার রাখার কাজ সম্পন্ন হলে বহু বাড়ি রক্ষা করা সম্ভব হতে পারত। একই সঙ্গে অগ্নিনির্বাপণ কর্মীদের জীবনও কম ঝুঁকির মুখে পড়ত।

বন ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের দাবি

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার করলেই হবে না। পুরো বন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে।

একই ধরনের পাইন গাছের বিশাল একটানা বনভূমির পরিবর্তে কৃষিজমি, চারণভূমি এবং বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদের সমন্বয়ে বৈচিত্র্যময় ভূমি ব্যবহার গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি বনজুড়ে আরও বেশি অগ্নিনিরোধক করিডর তৈরি করা জরুরি।

তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে পুরোনো বন ব্যবস্থাপনা আর কার্যকর নয়। ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কঠোর বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।


ফ্রান্সের ভয়াবহ দাবানলের পর বন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অগ্নি প্রতিরোধে ব্যর্থতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতের বিপর্যয় এড়াতে বন ব্যবস্থাপনায় মৌলিক পরিবর্তন জরুরি।

জনপ্রিয় সংবাদ

যুদ্ধের চেয়ে বড় সংকট: নিয়ন্ত্রণহীন সংঘাতের মুখে বিশ্ব

বন ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতায় ভয়াবহ দাবানল, ফ্রান্সে কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় অগ্নিকাণ্ডে প্রশ্নের মুখে প্রশাসন

০৫:১৪:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬

দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় দাবানলের পর দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বন ব্যবস্থাপনা ও অগ্নি প্রতিরোধ নিয়ে তীব্র বিতর্ক। বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং বন মালিকদের অভিযোগ, ২০২২ সালের ভয়াবহ দাবানলের পর সরকার যেসব প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছিল, সেগুলোর বড় অংশই বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে এবারের আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে শত শত বাড়ি ধ্বংস করেছে এবং শান্তিকালে ফ্রান্সের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জনসাধারণের সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

এই অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২৪০টি বাড়ি পুড়ে গেছে এবং ৪২ হাজার হেক্টরেরও বেশি বনভূমি আগুনে ধ্বংস হয়েছে। বিপুল সংখ্যক মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে।

চার বছর আগের সতর্কবার্তা বাস্তবায়িত হয়নি

২০২২ সালে বোর্দোর আশপাশে বড় দাবানলের পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোরভাবে বন পরিষ্কার ও অগ্নি প্রতিরোধ বিধিমালা কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

নিয়ম অনুযায়ী, বাড়ির চারপাশে অন্তত ৫০ মিটার পর্যন্ত ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখা, নিচু ডালপালা ছাঁটাই করা এবং আগুন ছড়ানোর মতো শুকনো উদ্ভিদ অপসারণ করার কথা ছিল। নির্দেশনা না মানলে জরিমানার ব্যবস্থাও রাখা হয়।

কিন্তু চার বছর পর দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ এলাকায় সেই নির্দেশনা কার্যকর হয়নি। বহু এলাকায় বাড়ির একেবারে গা ঘেঁষে ঝোপঝাড় ও গাছপালা রয়ে গেছে, যা আগুন দ্রুত বসতিতে পৌঁছে দিতে সাহায্য করেছে।

কেন মানা হয়নি নিয়ম?

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক বাসিন্দা নিজেদের বাড়ির আশপাশের জমির মালিক নন। ফলে আইন অনুযায়ী পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব থাকলেও বাস্তবে তারা সেই কাজ করতে পারেননি।

অন্যদিকে অনেকের পক্ষে প্রতিবছর কয়েক হাজার ইউরো ব্যয় করে ঝোপঝাড় পরিষ্কার করাও সম্ভব নয়। ফলে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের অনেকেই স্বীকার করেছেন, নিয়ম বাস্তবায়নে তাদেরও ঘাটতি ছিল।

France's largest wildfire in decades 'under control', says minister

আগুন কীভাবে এত দ্রুত ছড়াল?

তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, একটি বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারদের ব্যবহৃত ঝোপ পরিষ্কার করার যন্ত্র থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়।

তবে আগুন এত দ্রুত বিস্তৃত হওয়ার পেছনে আরও কয়েকটি কারণ কাজ করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

বছরের পর বছর ধরে একই ধরনের পাইন গাছ দিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা ভরে ওঠায় বনটি কার্যত একটানা দাহ্য অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। মাঝখানে পর্যাপ্ত ফাঁকা এলাকা বা অগ্নিনিরোধক করিডর তৈরি না হওয়ায় আগুন বাধাহীনভাবে এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক জায়গায় এমন অবস্থা ছিল যেন পাশাপাশি সাজানো অসংখ্য দেশলাই কাঠিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও স্পষ্ট

বিজ্ঞানীরা বলছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়িয়েছে। এর ফলে তাপমাত্রা বেড়ে বনভূমি আরও শুষ্ক হয়ে পড়ছে এবং সামান্য স্ফুলিঙ্গ থেকেও বড় দাবানল তৈরি হচ্ছে।

এই অগ্নিকাণ্ডে প্রথমবারের মতো ফ্রান্সে আগুনের তীব্রতার কারণে বিশেষ ধরনের অগ্নিমেঘ সৃষ্টি হয়েছে, যা আগুন নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তোলে।

দমকল বাহিনীর ক্ষোভ

দমকল সদস্যরা জানিয়েছেন, অনেক বাড়ি রক্ষার সময় তারা দেখেছেন বাড়ির চারপাশে আগুন ধরার মতো শুকনো ঝোপঝাড় অক্ষত অবস্থায় ছিল।

তাদের মতে, আইন অনুযায়ী পরিষ্কার রাখার কাজ সম্পন্ন হলে বহু বাড়ি রক্ষা করা সম্ভব হতে পারত। একই সঙ্গে অগ্নিনির্বাপণ কর্মীদের জীবনও কম ঝুঁকির মুখে পড়ত।

বন ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের দাবি

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার করলেই হবে না। পুরো বন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে।

একই ধরনের পাইন গাছের বিশাল একটানা বনভূমির পরিবর্তে কৃষিজমি, চারণভূমি এবং বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদের সমন্বয়ে বৈচিত্র্যময় ভূমি ব্যবহার গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি বনজুড়ে আরও বেশি অগ্নিনিরোধক করিডর তৈরি করা জরুরি।

তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে পুরোনো বন ব্যবস্থাপনা আর কার্যকর নয়। ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কঠোর বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।


ফ্রান্সের ভয়াবহ দাবানলের পর বন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অগ্নি প্রতিরোধে ব্যর্থতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতের বিপর্যয় এড়াতে বন ব্যবস্থাপনায় মৌলিক পরিবর্তন জরুরি।