বিশ্বের বৃহত্তম রেইনফরেস্ট আমাজনকে দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপীয়দের আগমনের আগে প্রায় জনশূন্য ও অক্ষত বনভূমি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু নতুন এক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা সেই ধারণাকে আরও একবার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। ঘন বনভূমির নিচে লুকিয়ে থাকা শত শত বিশালাকার মাটির স্থাপনা আবিষ্কার করে গবেষকেরা বলছেন, এক হাজার বছরেরও বেশি আগে এখানে সুসংগঠিত ও জটিল মানবসমাজ গড়ে উঠেছিল।
ঘন বন ভেদ করে নতুন আবিষ্কার
আমাজনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্রাজিল, বলিভিয়া ও পেরুর সীমান্তঘেঁষা বিস্তীর্ণ এলাকায় বিশেষ ধরনের লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকেরা বনভূমির নিচে লুকিয়ে থাকা প্রায় চার শতাধিক অজানা স্থাপনার সন্ধান পেয়েছেন। এই প্রযুক্তির সাহায্যে গাছপালার ঘন ছাউনির নিচের ভূমির প্রকৃত আকৃতি দেখা সম্ভব হয়েছে।
আবিষ্কৃত স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশাল বৃত্ত, বর্গক্ষেত্র এবং অন্যান্য জ্যামিতিক নকশা। অনেকগুলোর সঙ্গে সংযোগকারী রাস্তারও অস্তিত্ব মিলেছে। গবেষকদের মতে, এসব স্থাপনা খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ছয়শ থেকে খ্রিস্টীয় প্রায় আটশ পঞ্চাশ সালের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল।
মাটির নিচে লুকিয়ে ছিল বিশাল নির্মাণকাজ
গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ স্থাপনার বিস্তৃতি প্রায় সাত একর পর্যন্ত। অনেক স্থানে নয় মিটার চওড়া এবং সাড়ে চার মিটার গভীর পরিখা রয়েছে। সবচেয়ে বড় স্থাপনাটি একশ বিশ একরেরও বেশি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় নির্মাণকাজ পরিচালনা করতে হলে সুসংগঠিত সমাজ, পরিকল্পনা এবং বিপুল জনশক্তির প্রয়োজন ছিল। ফলে এটি প্রমাণ করে যে সেই সময়ের আমাজনে মানুষের বসতি ও সামাজিক সংগঠন আগের ধারণার তুলনায় অনেক বেশি উন্নত ছিল।
উৎসব, আচার ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্র
গবেষকেরা স্থানীয় আদিবাসীদের মৌখিক ঐতিহ্য এবং প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করে ধারণা করছেন, এসব স্থাপনা মূলত উৎসব, ধর্মীয় আচার, রাজনৈতিক সমাবেশ, নৃত্য, সংগীত এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হতো।
তাঁরা এই প্রাচীন সমাজের নাম দিয়েছেন ‘আকিরি’। গবেষকদের ধারণা, এটি ছিল বহু ভাষাভাষী ও বহু সংস্কৃতির মানুষের সমন্বয়ে গঠিত একটি সমাজ, যাদের মধ্যে একটি অভিন্ন বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল।

রহস্য এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত নয়
গবেষণায় অংশ না নেওয়া প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, এসব স্থাপনার প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। এগুলো স্থায়ী বসতি ছিল কি না, নাকি কেবল আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহৃত হতো—তা নিশ্চিত হতে আরও খননকাজের প্রয়োজন রয়েছে।
কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এসব নকশার সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞানেরও কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণা ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
আমাজনের ইতিহাস নতুনভাবে ভাবার সময়
গবেষণাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে। বহু শতাব্দী আগে ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা আমাজনে ঘনবসতিপূর্ণ বড় বড় জনপদের বর্ণনা দিয়েছিলেন। পরে রোগ, উপনিবেশ স্থাপন এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ব্যাপক মৃত্যুর কারণে সেই বিবরণকে দীর্ঘদিন অতিরঞ্জিত বলে মনে করা হয়েছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাজনের বিভিন্ন স্থানে রাস্তা, খাল, উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ, আবাসিক প্ল্যাটফর্ম এবং অন্যান্য অবকাঠামোর সন্ধান পাওয়ায় সেই পুরোনো বিবরণ নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
গবেষণা দলের ধারণা, আকিরি সমাজের সর্বোচ্চ বিকাশের সময় এই অঞ্চলেই জনসংখ্যা প্রায় ত্রিশ লাখ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। যদিও এই সংখ্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এখনো মতভেদ রয়েছে।
বিপদের মুখে অমূল্য ঐতিহ্য
গবেষকদের সতর্কবার্তা, বন উজাড়, কাঠ সংগ্রহ এবং কৃষিজমি সম্প্রসারণের কারণে এসব প্রত্নস্থানের অনেকগুলো ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরও বহু নিদর্শন হয়তো এখনো ঘন বনভূমির নিচে লুকিয়ে রয়েছে, আবার অনেকগুলো ধ্বংসও হয়ে যেতে পারে।
তাঁদের মতে, এই আবিষ্কার শুধু আমাজনের অতীত ইতিহাস নয়, মানবসভ্যতার বিকাশ সম্পর্কে প্রচলিত বহু ধারণাকেও নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ করে দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















