বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের মালিক ইলন মাস্ককে ঘিরে আবারও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে কলাম লেখক জামেল বুই অভিযোগ করেছেন, মাস্ক তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে এমন রাজনৈতিক ভাষ্য ও বক্তব্য প্রচার করছেন, যা শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ, অভিবাসীবিরোধিতা এবং উগ্র ডানপন্থী মতাদর্শের সঙ্গে গভীরভাবে সাযুজ্যপূর্ণ। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এত বিতর্কিত বক্তব্যের পরও কেন মাস্ক জনপরিসরে তুলনামূলকভাবে কম সমালোচনার মুখে পড়েন।
একটি কুখ্যাত উপন্যাসের প্রসঙ্গ
নিবন্ধের শুরুতে লেখক আলোচনায় এনেছেন ‘দ্য টার্নার ডায়েরিজ’ নামের একটি কুখ্যাত শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী উপন্যাসের কথা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বইটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার উৎখাত, বর্ণভিত্তিক সহিংসতা, ইহুদি ও কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে গণহত্যা এবং একটি সম্পূর্ণ শ্বেতাঙ্গ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কল্পচিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
লেখকের দাবি, এই বইটি দীর্ঘদিন ধরে উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে প্রভাব বিস্তার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত একাধিক শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যেও বইটির প্রভাবের উল্লেখ পাওয়া গেছে। তাঁর মতে, বইটির ভাষা ও ধারণা এখনো বিভিন্ন উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক আলোচনায় প্রতিফলিত হয়।
মাস্কের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন
জামেল বুইর মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ইলন মাস্ক তাঁর এক্স অ্যাকাউন্টে এমন কিছু পোস্ট করেছেন, যেখানে ‘বিশ্বাসঘাতকদের আগে, পরে আগ্রাসীদের’ মতো স্লোগান পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। লেখকের অভিযোগ, এসব বক্তব্য এমন এক রাজনৈতিক ভাষ্যকে শক্তিশালী করে, যেখানে অভিবাসন ও জনসংখ্যাগত পরিবর্তনকে পশ্চিমা সভ্যতার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়।
নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, মাস্ক একাধিকবার ‘রিমাইগ্রেশন’ বা অশ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে তাদের কথিত উৎসভূমিতে ফেরত পাঠানোর ধারণার প্রতি সমর্থনসূচক মন্তব্য করেছেন বলে সমালোচকরা দাবি করেন। ইউরোপের বিভিন্ন উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে এই ধারণা প্রচার করে আসছে।
জনসংখ্যা নিয়ে মাস্কের উদ্বেগ
লেখকের মতে, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় জন্মহার কমে যাওয়া এবং অভিবাসন বৃদ্ধি নিয়ে ইলন মাস্কের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের অন্যতম ভিত্তি। অতীতে মাস্ক প্রকাশ্যে বলেছেন, কম জন্মহার পশ্চিমা বিশ্বের জন্য বড় হুমকি এবং অভিবাসনও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, এসব বক্তব্যকে অনেক গবেষক ও বিশ্লেষক তথাকথিত ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ তত্ত্বের সঙ্গে মিল খুঁজে পান। এই তত্ত্বে বলা হয়, অভিবাসনের মাধ্যমে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে। মূলধারার গবেষকরা এ তত্ত্বকে ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্রতত্ত্ব হিসেবে বিবেচনা করেন।
বর্ণবাদ অস্বীকার করেছেন মাস্ক
লেখক উল্লেখ করেন, সম্প্রতি দ্য ইকোনমিস্ট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইলন মাস্ক নিজেকে বর্ণবাদী নন বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, দ্রুত বর্ধনশীল এমন জনগোষ্ঠী, যাদের মূল্যবোধ পশ্চিমা সমাজের মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামাজিক সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে।
মাস্কের সমর্থকদের মতে, তাঁর বক্তব্য মূলত অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন, নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক সংহতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। তবে সমালোচকদের মতে, তাঁর ব্যবহৃত ভাষা উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বক্তব্যের সঙ্গে বিপজ্জনকভাবে মিলে যায়।
গবেষকদের মূল্যায়ন
নিবন্ধে কুইন স্লোবোডিয়ান ও বেন টারনফ-এর লেখা মাস্কিজম: আ গাইড ফর দ্য পারপ্লেক্সড বইয়ের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, মাস্কের রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে শ্বেতাঙ্গ পরিচয়, জন্মহার এবং তথাকথিত ‘ওয়োক’ সংস্কৃতির বিরোধিতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। লেখকদের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতাও এই দৃষ্টিভঙ্গির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
জনপরিসরে বিতর্কের প্রশ্ন
মতামত নিবন্ধের শেষাংশে জামেল বুই প্রশ্ন তোলেন, ইলন মাস্কের প্রযুক্তি, ব্যবসা ও মহাকাশ উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন অনেক ক্ষেত্রেই গৌণ বিষয় হিসেবে দেখা হয়।
লেখকের মতে, বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মালিক হিসেবে মাস্কের বক্তব্য কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে তাঁর রাজনৈতিক ভাষ্য ও জনসমক্ষে দেওয়া মন্তব্যগুলোর প্রভাব নিয়ে আরও গভীর জনআলোচনা হওয়া উচিত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















