আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবকে সামনে রেখে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও জোরদার করছে ডেনমার্ক। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশটি প্রথমবারের মতো বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনাদের গ্রিনল্যান্ডে মোতায়েন করতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার মেয়াদ চার মাস থেকে বাড়িয়ে ১১ মাস করা হয়েছে এবং প্রথমবারের মতো নারীদেরও এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে।
সোমবার প্রায় ১ হাজার ৬০০ নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত তরুণ-তরুণী ১১ মাসের নতুন সামরিক সেবার কার্যক্রম শুরু করেছেন। ডেনমার্ক সরকারের লক্ষ্য, আগামী বছরগুলোতে দেশের প্রতিরক্ষা শক্তিকে আরও সুসংগঠিত ও আধুনিক করে তোলা।
প্রথমবার গ্রিনল্যান্ডে বাধ্যতামূলক সেনা মোতায়েন
চলতি মাসের শেষ দিকে ১০০ জনের বেশি সেনাসদস্যের একটি দল গ্রিনল্যান্ডে পাঠানো হবে। তারা সেখানে এক মাস অবস্থান করে এতদিন পেশাদার সেনাদের পরিচালিত বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করবেন। এটি হবে গ্রিনল্যান্ডে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবায় অংশ নেওয়া সেনাদের প্রথম মোতায়েন।

গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক গুরুত্বও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার স্বায়ত্তশাসিত এই ড্যানিশ ভূখণ্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি তুলে ধরেছেন। তবে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক—উভয় সরকারের পক্ষ থেকেই সেই প্রস্তাব দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা জোরদারে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
ডেনমার্ক ২০২৪ সালে ঘোষণা দেয় যে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবায় নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং সেবার মেয়াদ বাড়িয়ে ১১ মাস করা হবে। একই সঙ্গে বছরে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তের সংখ্যা ৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২০৩৩ সালের মধ্যে ৭ হাজার ৫০০-তে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় প্রথম পাঁচ মাস মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এরপর ছয় মাস বিভিন্ন অপারেশনাল দায়িত্ব পালন করতে হবে। পাশাপাশি ড্রোন পরিচালনাসহ আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তি শেখানোর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ইউনিটও চালু করা হয়েছে।
নিরাপত্তা পরিবেশের পরিবর্তনের প্রভাব
গত মাসে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, জোটের প্রতিটি অংশের পাশাপাশি নিজেদের প্রতিটি ভূখণ্ড রক্ষায় তাঁর দেশ প্রস্তুত রয়েছে।
১৯ বছর বয়সী নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সিলাস নোর জানান, দীর্ঘ সময়ের প্রশিক্ষণের সুযোগকে তিনি ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাঁর মতে, ১১ মাসের সেবার মাধ্যমে সামরিক জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা আরও গভীরভাবে অর্জন করা সম্ভব হবে।
উত্তর ইউরোপে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার ধারা
ডেনমার্কে ১৮ বছর পূর্ণ করা সুস্থ তরুণ-তরুণীদের জন্য লটারিভিত্তিক বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে অধিকাংশ আসন স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমেই পূরণ হয়ে আসছে এবং প্রয়োজন হলে লটারির মাধ্যমে বাকি সদস্য নির্বাচন করা হয়।
ডেনমার্কের প্রতিবেশী সুইডেন, ফিনল্যান্ড ও নরওয়েসহ এস্তোনিয়া, লাতভিয়া এবং লিথুয়ানিয়াতেও বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। আর্কটিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে এসব দেশও সামরিক প্রস্তুতি জোরদারে গুরুত্ব দিচ্ছে।
গ্রিনল্যান্ডে প্রথমবার বাধ্যতামূলক সেনা মোতায়েনের এই সিদ্ধান্ত ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে এটি আর্কটিক অঞ্চলের বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















