দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ ও খরার কারণে ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী রাইনের বিভিন্ন অংশে পানির উচ্চতা ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এর ফলে নৌপরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি এবং পানির সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জার্মানির কোলোন এবং নেদারল্যান্ডসের লোবিথ এলাকায় গত সপ্তাহে রাইন নদীর পানির উচ্চতা রেকর্ড শুরুর পর থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। একই সময়ে ইউরোপের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদী—বিশেষ করে দানিউব ও ইতালির পো নদীতেও পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
তাপপ্রবাহে আরও বাড়ছে সংকট
ইউরোপের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের অনেক দেশে আগামী অন্তত এক সপ্তাহ তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস রয়েছে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের খরা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানিয়েছে, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপে খরার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে এবং অধিকাংশ এলাকায় তা এখনও সংকটজনক অবস্থায় রয়েছে।
জার্মানির নিম্ন পানি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষ দিকে রাইন নদীর ৪৪ শতাংশ এবং দানিউব নদীর ৭৮ শতাংশ পরিমাপ কেন্দ্র অত্যন্ত নিম্ন পানি স্তর রেকর্ড করেছে।

রাইন নদীতে নৌপরিবহনে চাপ
সুইস আল্পস থেকে উৎপন্ন হয়ে উত্তর সাগরে মিলিত হওয়া রাইন ইউরোপের সবচেয়ে ব্যস্ত নৌপথগুলোর একটি। পানির স্তর কমে যাওয়ায় বড় মালবাহী জাহাজগুলোকে পূর্ণ ধারণক্ষমতায় চলাচল করতে পারছে না।
জার্মানির কাওব এলাকায় নদীর নাব্যতা পরিমাপ কেন্দ্রকে রাইনের নৌচলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে ধরা হয়। সেখানে পানির গভীরতা এতটাই কমে গেছে যে জাহাজগুলোকে কম মাল নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
নদীপথ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আপাতত নৌচলাচল পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে নিরাপদ চলাচলের জন্য একটি জাহাজের পরিবর্তে একাধিক জাহাজে মাল ভাগ করে পরিবহন করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়বে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিলম্বের আশঙ্কা তৈরি হবে।
দানিউবেও জ্বালানি উৎপাদনে ধাক্কা
দানিউব নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ায় সার্বিয়া ও রোমানিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
হাঙ্গেরিতে শীতলীকরণ ব্যবস্থার জন্য পর্যাপ্ত পানি না থাকায় দেশের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রটি পুনরায় চালু করা কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে সার্বিয়ায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমিয়ে দিতে হয়েছে। রোমানিয়া নদীর পানি প্রবাহ বাড়াতে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে নদীতীরের বড় পাথর অপসারণ করেছে, যাতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পর্যাপ্ত শীতলীকরণ পানি পৌঁছায়।

ইতালিতে কৃষি ও সুপেয় পানির ঝুঁকি
ইতালির দীর্ঘতম নদী পো-তেও পানির স্তর ঐতিহাসিকভাবে নিচে নেমে গেছে। পুরো পো উপত্যকায় খরা সতর্কতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে।
নদীর মোহনায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি নদীর ভেতরে প্রবেশ করছে। এতে নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং কৃষকদের সেচের জন্য ব্যবহৃত পানির মানও নষ্ট হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সুপেয় পানির সরবরাহও ব্যাহত হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
গবেষকদের মতে, ইউরোপে দীর্ঘমেয়াদে বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ না থাকলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে উচ্চ তাপমাত্রা মাটি ও জলাশয় থেকে বেশি আর্দ্রতা বাষ্পীভূত করছে। ফলে খরা আরও ঘন ঘন এবং তীব্র আকারে দেখা দিচ্ছে।
একই সঙ্গে গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় গৃহস্থালি, কৃষি ও শিল্প খাতে পানির চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে। এতে নদী ও হ্রদের পানি দ্রুত কমে যাচ্ছে এবং মিঠাপানির উৎসের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
ইউরোপীয় জলবায়ু পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী খরা শুধু কৃষি ও নৌপরিবহন নয়, দাবানলের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। এতে কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি পায় এবং জলবায়ু সংকট আরও তীব্র হয়।
ইউরোপজুড়ে চলমান এই পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি ইতোমধ্যেই অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, কৃষি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















