মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতে না গিয়ে এবার বাণিজ্যপথ, জ্বালানি অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান। দেশটির নেতৃত্বের বিশ্বাস, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের বর্তমান কৌশল হলো সংঘাতকে এমনভাবে বিস্তৃত করা যাতে তা পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ না নেয়, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ায়।
চাপের কেন্দ্র হরমুজ প্রণালি
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেই এই কৌশলের মূল লক্ষ্য। বৈশ্বিক তেলের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের ধারণা, এই পথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ যত বাড়বে, ততই আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো সংকট নিরসনে সমঝোতার পথে এগোতে আগ্রহী হবে।
তেহরান চায়, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনায় তাদের আরও বড় ভূমিকা স্বীকৃতি পাক। ইরানের অবস্থান হলো, প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজের ওপর প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ও নির্দিষ্ট সেবামূল্য আরোপের অধিকার তাদের থাকা উচিত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, হরমুজ আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবেই উন্মুক্ত থাকবে এবং সেখানে কোনো একক দেশের নিয়ন্ত্রণ বা ফি আরোপ গ্রহণযোগ্য নয়।

সংঘাতের পরিধি বাড়ানোর ইঙ্গিত
হরমুজের বাইরে লোহিত সাগর ও সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনাগুলোকেও সম্ভাব্য চাপের ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরছে ইরান। এর মাধ্যমে তেহরান বোঝাতে চাইছে যে, প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্যের আরও বিস্তৃত অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা তাদের পক্ষে সম্ভব।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইরান নিয়মিত নতুন নতুন চাপের ক্ষেত্র তৈরি করে প্রতিপক্ষকে কৌশলগতভাবে ব্যস্ত রাখতে চায়। কখনও নতুন এলাকা, কখনও নতুন ধরনের অস্ত্র, আবার কখনও নতুন লক্ষ্যবস্তু সামনে এনে তারা সংঘাতের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক হিসাবকে গুরুত্ব দিচ্ছে তেহরান
উপসাগরীয় সূত্রগুলোর দাবি, ইরানের ধারণা হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে জড়াতে অনিচ্ছুক। সেই কারণেই চাপ বাড়াতে থাকলে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন আলোচনায় ছাড় দিতে পারে বলে মনে করছে তেহরান।
ইরানের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন অনুযায়ী, অতীতে নমনীয় অবস্থান নেওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র চাপ বাড়িয়েছিল। ফলে এখন তাদের বিশ্বাস, শক্ত অবস্থান তৈরি না করে অর্থবহ আলোচনা সম্ভব নয়।

আলোচনার আগে শক্ত অবস্থান গড়ার চেষ্টা
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনার ইঙ্গিত দেওয়া হলেও ইরান জানিয়েছে, বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের লক্ষ্য এখন আলোচনার দরজা বন্ধ করা নয়; বরং আলোচনায় বসার আগে নিজেদের দর-কষাকষির অবস্থান আরও শক্তিশালী করা। তাদের ধারণা, চাপ সৃষ্টি করতে পারলেই ভবিষ্যৎ আলোচনায় সুবিধাজনক অবস্থান নিশ্চিত করা যাবে।
রক্ষণাত্মক অবস্থানে আঞ্চলিক জোট
সংঘাতের আশঙ্কা বাড়তে থাকায় উপসাগরীয় দেশগুলো বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে নতুন সামুদ্রিক সহযোগিতা জোরদার করছে। এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়ানো নয়; বরং জাহাজকে নিরাপত্তা দেওয়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ সচল রাখা।

এতে বোঝা যাচ্ছে, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রধান অগ্রাধিকার এখন বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।
সহনশীলতার লড়াইয়ে নতুন অধ্যায়
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মূলত সহনশীলতার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ইরানের হিসাব, তারা অর্থনৈতিক চাপ দীর্ঘ সময় ধরে সহ্য করতে পারবে, কিন্তু বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বারবার বিঘ্ন ঘটলে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন জোটের জন্য সেই চাপ সামলানো কঠিন হয়ে উঠবে।
তবে একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, উভয় পক্ষই যদি পাল্টাপাল্টি চাপের কৌশল অব্যাহত রাখে, তাহলে সীমিত সংঘাতও অনিয়ন্ত্রিত বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















