ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত জর্ডানকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা অংশীদার হওয়ায় দেশটি এখন ইরানের বাড়তি সামরিক চাপের মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র জর্ডানের ভূখণ্ড ও সামরিক ঘাঁটি বেশি ব্যবহার করায় তেহরান এখন দেশটিকে সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দেখছে।
গত কয়েক সপ্তাহে ইরান থেকে ছোড়া একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন জর্ডানের দিকে এসেছে। জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এসব হামলার বেশিরভাগই প্রতিহত করা হয়েছে। তবে ধারাবাহিক হামলায় দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
জর্ডানের রাজধানী আম্মানের অনেক বাসিন্দা মনে করেন, এই পরিস্থিতির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিই বড় ভূমিকা রেখেছে। তাদের অভিযোগ, ওয়াশিংটনের সামরিক কৌশলের কারণে জর্ডান এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে, যার সঙ্গে দেশটির সরাসরি কোনো স্বার্থ নেই।
তেলসম্পদহীন এবং শক্তিশালী প্রতিবেশীদের বেষ্টিত জর্ডান কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। প্রতি বছর দেশটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা পেয়ে থাকে। বর্তমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জর্ডানের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ইরান থেকে তুলনামূলক দূরত্ব এবং মার্কিন বাহিনীকে ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ায় দেশটি এখন ওয়াশিংটনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার।
তবে এই সহযোগিতার মূল্যও দিতে হচ্ছে জর্ডানকে। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি যত বাড়ছে, ততই দেশটি ইরানের সামরিক চাপের মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাবও জোরালো হচ্ছে।
জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহর জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে জটিল। একদিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মিত্র, অন্যদিকে দেশের বড় অংশের জনগণ, বিশেষ করে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত নাগরিকরা, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ও ইসরায়েলকে সমর্থনের বিরোধিতা করেন। ফলে সরকারকে নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ জনমতও সামাল দিতে হচ্ছে।
জর্ডানের সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শুরুতে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে ইরানের হামলার গতি বেড়েছে। হামলার বেশিরভাগ লক্ষ্য ছিল মার্কিন সেনা অবস্থান করা ঘাঁটি। একটি হামলায় জর্ডানের পূর্বাঞ্চলের একটি বিমানঘাঁটিতে তিন মার্কিন সেনা নিহত হন। এছাড়া লোহিত সাগর উপকূলের আকাবা বন্দর এলাকাও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
রাজধানী আম্মানসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিকবার বিমান হামলার সতর্কসংকেত বেজেছে। যদিও বেসামরিক স্থাপনায় বড় ধরনের হামলার খবর নেই, তবুও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে জর্ডানের সাবেক সংসদ সদস্য, উপজাতীয় নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে মার্কিন সেনা উপস্থিতির বিরোধিতা করেছেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে জর্ডানের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া দ্বিপক্ষীয় চুক্তি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, জর্ডান এই যুদ্ধে কোনো পক্ষ নয় এবং দেশের জনগণকে অন্যের সংঘাতের মূল্য দিতে হওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে জর্ডানের সরকার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাকে দেশটির সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে সরকার বলছে, তারা দেশের আকাশসীমা ও নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তবে সরকারি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার বিষয়টি তুলনামূলকভাবে সংযত ভাষায় তুলে ধরছেন।
ইরানও কূটনৈতিক পর্যায়ে জর্ডানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। তেহরানের দাবি, জর্ডান তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জর্ডান আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব থেকে সরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই দেশটির ওপর সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়বে এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















