পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের রাওয়ালাকোটে চলমান বিক্ষোভ নতুন করে সহিংস মোড় নিয়েছে। আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা দিতে অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে সীমিত সামর্থ্য নিয়ে কাজ করছেন চিকিৎসকেরা। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো, সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলনে নামলেও নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বহু মানুষের প্রাণ গেছে। তবে স্থানীয় প্রশাসন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেবল সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিয়েছে।
অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে বাড়ছে আহতের চাপ
রাওয়ালাকোটের একটি অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে আহতদের চিকিৎসা চলছে সীমিত ওষুধ ও সরঞ্জাম দিয়ে। চিকিৎসকদের ভাষ্য, তারা রক্তক্ষরণ বন্ধ করা, ক্ষত পরিষ্কার করা এবং ছোট আঘাতের চিকিৎসা দিতে পারলেও বুকে, মাথায় বা পেটে গুরুতর গুলিবিদ্ধ রোগীদের উন্নত হাসপাতালে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
চিকিৎসকদের দাবি, গত কয়েক দিনে বহু গুলিবিদ্ধ মানুষ সেখানে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের বেশির ভাগই তরুণ, যাদের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
‘আমরা শুধু অধিকার চেয়েছিলাম’
আহত বিক্ষোভকারীদের একজন বলেন, তারা সাশ্রয়ী আটা, বিদ্যুৎ এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন। কিন্তু এর বদলে তাদের ওপর গুলি চালানো হয়েছে। তার প্রশ্ন, “আমাদের অপরাধ কী ছিল?”

বিক্ষোভে নিহতদের পরিবারের সদস্যরাও একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন। একজন মা বলেন, তার ছেলে জানত আন্দোলনে ঝুঁকি আছে, তবুও মানুষের অধিকারের জন্য দাঁড়ানোকে সে নিজের দায়িত্ব মনে করেছিল।
দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকে আন্দোলন
বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছে যৌথ আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি। তাদের দাবি, জীবনযাত্রার ব্যয়, বিদ্যুতের মূল্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট দীর্ঘদিন ধরে মানুষের ক্ষোভ তৈরি করেছে। গত বছরের একটি সমঝোতা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি বলেও তাদের অভিযোগ।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার বলছে, আন্দোলনের আড়ালে নির্বাচনী পরিবেশ অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। তাদের দাবি, আন্দোলনকারী সংগঠনের কিছু সদস্য সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং এ কারণেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
নিষিদ্ধ সংগঠনকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
যৌথ আওয়ামী অ্যাকশন কমিটিকে জুন মাসে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ সংগঠনটিকে বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে সংগঠনটির নেতারা এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছেন, তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন।
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা হয়েছে এবং সেখান থেকে অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে। তবে আন্দোলনের নেতারা বলছেন, এসব অভিযোগের পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ নেই।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, খাদ্যসংকটের অভিযোগ
ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত, বিভিন্ন সড়কে অবরোধ এবং নিরাপত্তা তল্লাশির কারণে এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। অনেক দোকানপাট বন্ধ থাকায় খাদ্যসংকটের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ মোটরসাইকেলে করে খাদ্যপণ্য আনার চেষ্টা করছেন বলেও জানা গেছে।
তবে প্রশাসনের দাবি, তারা খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশে বাধা দিচ্ছে না; বরং সরবরাহ অব্যাহত রাখতে সহায়তা করছে।
পরিস্থিতি নিয়ে বিপরীতমুখী বক্তব্য
বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করছেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। বিপরীতে প্রশাসনের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালায়নি; কেবল জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে ঘটনাস্থলে থাকা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের পর্যবেক্ষণে বিক্ষোভ চলাকালে প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহার দেখা না গেলেও রাতে গুলির শব্দ শোনা গেছে। তবে কারা গুলি চালিয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















