যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়ে আবারও বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে, অন্যদিকে ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, বর্তমানে কোনো আলোচনা হচ্ছে না এবং শিগগিরই এমন কোনো বৈঠকেরও পরিকল্পনা নেই। এর মধ্যেই হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে অজ্ঞাত উৎস থেকে হামলার ঘটনা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
আলোচনার দাবি ও অস্বীকার
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ইরানের অনুরোধে এবং সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারসহ কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতায় আলোচনা চলছে। তিনি এটিকে তেহরানের জন্য “শেষ সুযোগ” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, একটি গ্রহণযোগ্য চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
কিন্তু একই দিনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না এবং সামনে এমন কোনো বৈঠকের সূচিও নেই। তিনি বলেন, ইরানের আলোচকরা সবাই দেশেই অবস্থান করছেন। কেবল পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ধর্মীয় সফরে ইরাকে রয়েছেন।
ইরানের দাবি, বর্তমানে শুধু ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালীর ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

হরমুজে জাহাজে হামলা, উদ্বেগ বাড়ল
এই কূটনৈতিক বিভ্রান্তির মধ্যেই ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালীর নিকটে একটি মালবাহী জাহাজ অজ্ঞাত একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রক্ষেপণের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা।
বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। তাই এখানে যেকোনো নিরাপত্তা সংকট বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলও স্বাভাবিকের তুলনায় ধীরগতির রয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, আগের দিনের তুলনায় কম সংখ্যক তেলবাহী ও পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছে।
বাজারে আশার ইঙ্গিত
যদিও দুই দেশের বক্তব্যে অসঙ্গতি রয়েছে, তবুও সম্ভাব্য সমঝোতার আশায় আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এশিয়ার বাজারেও কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজার এখনো বিশ্বাস করছে যে শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।

ইরানের কৌশল কী?
আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের পরিবর্তে মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যপথ, জাহাজ চলাচল এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য অর্থনৈতিক ব্যয় বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে।
তাদের ধারণা, দীর্ঘমেয়াদে এই চাপ ওয়াশিংটনকে সমঝোতার পথে ফিরতে বাধ্য করতে পারে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে নতুন বার্তা
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্বকে “বিশ্বাসযোগ্য নয়” বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরানই নতুন বৈঠকের অনুরোধ করেছে এবং অচিরেই আরও আলোচনা হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং চুক্তি বা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ না হওয়া পর্যন্ত ইরানের জন্য পরিস্থিতি সহজ হবে না।
একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি
গত পাঁচ মাসে একাধিকবার দেখা গেছে, ট্রাম্প বড় ধরনের সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন, পরে সম্ভাব্য কূটনৈতিক আলোচনার কথা বলে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন।
অন্যদিকে ইরানও প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে এসেছে। দুই পক্ষের মধ্যে হরমুজ প্রণালী নিয়ে বিরোধ এখনো সবচেয়ে বড় অচলাবস্থার বিষয় হয়ে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, আগের সমঝোতা অনুযায়ী হরমুজে অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করার কথা ছিল। তবে ইরান বলছে, ওই সমঝোতায় তাদের নিজস্ব জলসীমা ও জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের অধিকার অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। ফলে এই বিরোধের দ্রুত সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















